আনোয়ার হোসেন
চিত্রগ্রাহক, বাংলাদেশ
সূর্য দীঘল বাড়ি, এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী, পুরস্কার, দহন, হুলিয়া, চাকা, অন্য জীবন, চিত্রা নদীর পারে, লালসালু, লালন, ও শ্যামল ছায়া

 

আনোয়ার হোসেন বাংলাদেশের আলোকচিত্রশিল্পী ও চিত্রগ্রাহক। দেশে ও বিদেশে একজন নান্দনীক আলোকচিত্রশিল্পী হিসেবে তিনি পরিচিত। বাংলাদেশের অসাধারণ কিছু চলচ্চিত্রেরও তিনি চিত্রগ্রাহক ছিলেন। সূর্য দীঘল বাড়ির মতো মাইলফলক ছুঁয়ে যাওয়া সিনেমার তিনি চিত্রগ্রাহক ছিলেন।

প্রাথমিক জীবন
আলোকচিত্রশিল্পী আনোয়ার হোসেন ১৯৪৮ সালের ৬ অক্টোবর পুরোনো ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা কাজ করতেন সিনেমা অফিসে। ১৯৬৭ সালে মাত্র দুই ডলার (তখনকার ৩০ টাকা) দিয়ে কেনা প্রথম ক্যামেরা দিয়ে তার আলোকচিত্রী জীবনের শুরু। প্রথম সাত বছর ধার করা ক্যামেরা আর চলচ্চিত্রের ধার করা ফিল্ম দিয়ে তিনি কাজ করেন। ঐ ফিল্মগুলো ছিল সাদাকালো। তিনি ৩৬ টাকা ব্যয়ে রঙিন ছবি তোলা শুরু করেন ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে। পরবর্তি ২০ বছর আলোকচিত্রের মাধ্যমে বাংলাদেশকে আবিষ্কারের চেষ্টা করেছেন। বুয়েটে পড়ালেখা করার সময় পরিচয় হয় সূর্য দীঘল বাড়ির পরিচালক মসিহউদ্দীন শাকেরের সঙ্গে। যোগ দেন চলচ্চিত্র আন্দোলনে। জড়িয়ে পড়েন চলচ্চিত্র নির্মাণেও।

পড়ালেখা
১৯৬৫ সালে আর্মানিটোলা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক শেষ করেন। ১৯৬৮ সালে নটরডেম কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক শেষ করেন। এরপর প্রকৌশলী পড়তে ভর্তি হন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েটে। আলোকচিত্রের আগ্রহ থেকে চিত্রগ্রহণে পড়তে যান ভারতের পুনে ফিল্ম ইনস্টিটিউটে। সেখান থেকে চিত্রগ্রহণে ডিপ্লোমা করেন।

কাজ
ছাত্রজীবনেই তিনি আলোকচিত্রশিল্পী হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। তিনি পাকিস্তানের শ্রেষ্ঠ আলোকচিত্রশিল্পীর পুরস্কার পান। এ ছাড়া তিনি জাপানে আয়োজিত আলোকচিত্র প্রতিযোগিতায় শ্রেষ্ঠ আলোকচিত্রশিল্পীর স্বর্ণপদক অর্জন করেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে তিনি ক্যামেরা নিয়ে অংশগ্রহণ করেন। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আলোকচিত্রী হিসেবে তিনি বাংলাদেশে সম্মানিত ও সংবর্ধিত হয়েছেন। স্বাধীনতার পর আনোয়ার হোসেন আলোকচিত্রশিল্পী ও স্থপতি হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের সাথে যুক্ত হন। চলচ্চিত্রের প্রতি তাঁর ভালোবাসা এবং চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনে সক্রিয়তার কারণেই তিনি সিনেমাটোগ্রাফি বিষয়ে উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য বৃত্তি নিয়ে ভারতের চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন ইনস্টিটিউটে অধ্যয়ন করতে চলে যান। আনোয়ার হোসেন ভারতীয় ফিল্ম ইনস্টিটিউটের স্বর্ণপদক জয়ী শিক্ষার্থী হিসেবে অধ্যয়ন শেষে দেশে ফিরে আসেন। দেশে ফিরেই আনোয়ার হোসেন শুরু করেন বাংলাদেশের অন্যতম চলচ্চিত্র ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’সিনেমার চিত্রগ্রহণের কাজ। মূলত আনোয়ার হোসেনের হাত ধরেই বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের চিত্রগ্রহণ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রবেশ করে। বাংলাদেশের এ যাবত স্মরণীয় যত শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র আছে তার সিংহভাগ আনোয়ার হোসেনের ক্যামেরায় চিত্রায়িত হয়েছে। ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’, ‘এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী’, ‘পুরস্কার’, ‘দহন’, ‘হুলিয়া’, ‘চাকা’, ‘অন্য জীবন’, চিত্রা নদীর পারে’, ‘লালসালু’, ‘লালন’, ‘শ্যামল ছায়া’সহ এমন অনেক অনন্য চলচ্চিত্রের চিত্রগ্রাহক ছিলেন।

বাংলাদেশের আলোকচিত্রশিল্পকে আন্তর্জাতিকতায় উন্নীত করার প্রায় একক কৃতিত্বের দাবিদার আলোকচিত্রশিল্পী আনোয়ার হোসেনের। বাংলাদেশের আলোকচিত্রশিল্পের আধুনিকায়নের পুরোধা পুরুষ আনোয়ার হোসেন। বাংলাদেশের আলোকচিত্রশিল্পে আন্তর্জাতিক পুরস্কার, খেতাব ও সম্মাননা অর্জনকারী শিল্পী তিনি। পাঁচবার বাংলাদেশের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান চিত্রগ্রহণে। ছবিগুলো হলো-‘সূর্য দীঘল বাড়ী’, ‘এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী’, ‘পুরস্কার’, , ‘অন্য জীবন’ও ‘লালসালু’।
মৃত্যু
১ ডিসেম্বর ২০১৮ তারিখে আনোয়ার হোসেন মারা যান। রাজধানী ঢাকার একটি হোটেল থেকে তাঁর মৃতদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।