জন্ম: ১৭ অক্টোবর, ১৯৯২
জন্মস্থান: চেন্নাই, তামিল নাড়ু, ভারত
পেশা: অভিনেত্রী

 

আপনি শিশুশিল্পী হিসেবে অভিনয় শুরু করেন…

আপনি এমন বলতে পারনে না। তবে ব্যাপারটা কিছুটা এরকমই ছিল। আমার বাবা মালায়ালাম চলচ্চিত্রের প্রযোজক। পঞ্চম শ্রেনী পর্যন্ত আমরা চেন্নাইতেই থাকতাম। ছুটিতে কেরালা আসতাম। আমার বাবা যদি শুটিং করতেন তাহলে মাঝে মাঝে কিছু শটে আমার চেহারা দেখাতেন। এভাবেই আমার চলচ্চিত্র যাত্রা শুরু। আমি শিশুশিল্পী হিসেবে যতগুলো চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছি। সবগুলোই আমার বাবার। এটা অত গুরুত্বপূর্ণ কিছু না।

আপনার বাবা বাবা-মা দুজনই চলচ্চিত্রের মানুষ। আপনার চলচ্চিত্রে আসা কি তাদের পরিকল্পনা ছিল?

আসলে আমি অভিনয় করতে চেয়েছিলাম। বাবা মা ভাবতেন, যখন অভিনয় করার সময় আসবে তা এমনিতেই আসবে। আমি নবম শ্রেণীতে পড়ার সময়ই কিন্তু চলচ্চিত্রের প্রস্তাব পাই। বাবা মা রাজি ছিলেন। তারা ভাবতেন এখনো আমি ছোট। তা ছাড়া তারা চাইতেন আমার পড়ালেখাটা শেষ হোক। এমনকি আমার উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করার পরও আমি তাড়াহুড়ো করিনি। আমি উচ্চতর পড়ার জন্য ফ্যাশন ডিজাইনকে বেছে নিয়েছিলাম।
 
ফ্যাশন ডিজাইন কেন?
কেরালার প্রায় সব বাবা মা তাদের ছেলেমেয়েদের প্রকৌশলী কিংবা চিকিতসক বানাবে। এটাই এখানকার কাঠামো। আমি ও আমার বোন এই গতবাধা রুটিনের বাইরে কিছু হতে চেয়েছিলাম। আমরা চলচ্চিত্র শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সৃজনশীল কোনো কাজ করতে চেয়েছিলাম। আমি এমন কিছু করতে চেয়েছি যা একদিকে সৃজনশীল আবার চলচ্চিত্রের সঙ্গেও সংশ্লিষ্ট। এ কারণে আমি ফ্যাশন ডিজাইন বেছে নিই। আমি চেন্নাই এর পার্ল একাডেমি থেকে চার বছরের কোর্স সম্পন্ন করি।

কখন ও কীভাবে আপনি প্রথম চলচ্চিত্রের প্রস্তাব পান?
প্রিয়ান (প্রিয়দর্শন) চাচা, বাবা ও মোহনলাল চাচা একসঙ্গে পড়ালেখা করেছেন। চলচ্চিত্রের কাজও শুরু করেছেন একসঙ্গে। প্রিয়ান চাচার প্রথম ছবি প্রযোজনা করেন বাবা, আবার সেখানে অভিনয় করেন মোহনলাল চাচা। বাবা তাঁকে প্রথম চলচ্চিত্র দিয়েছিলেন। আর প্রিয়ান চাচা আমাকে আমার প্রথম চলচ্চিত্র উপহার দিলেন। এটা নিজেদের মাধ্যে একটা বোঝাপড়ার বিষয় আরকি।

আমি তখন তৃতীয় বর্ষে পড়ি। প্রিয়ান চাচা আমাকে চলচ্চিত্রে অভিনয় করার প্রস্তাব করলেন। আমি তখন এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামে লন্ডনে পড়ছি। তিনি আমাকে ফোন করেন। তিনি বলেছিলেন, ‘তুমি ফিরে এলেই আমরা শুটিং শুরু করব।‘ আমার প্রতি তার এই বিশ্বাসে আমি অবাক হয়েছিলাম। কোনো কথা নেই সরাসরি শুটিংয়ের প্রস্তাব। আমি ভেবেছি প্রিয়ান চাচা যেহেতু আমার উপর এই বিশ্বাস রেখেছেন, আমারও অন্তত কিছু একটা করে দেখানো উচিত।

আসলে আমি ইতস্তত করছিলাম। কারণ আমি পড়ালেখা শেষ করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তিনি ভেবে বসেন আমি অভিনয়ে আগ্রহী নই। যাইহোক যেকোনোভাবে আমি দুটি চলচ্চিত্র ও আমার পড়ালেখা একসঙ্গেই শেষ করতে পেরেছি। ভাগ্যভালো, এখন আমি ¯œাতক। যার জন্য আমি গর্বিত। শেষ বছর কলেজে একটি প্রকল্পের কাজ ছিল। আমি চলচ্চিত্রটির শুটিং শেষ করে ফিরে এসে প্রকল্প শেষ করি। রেজাল্ট কিন্তু খারাপ হয়নি। আমি পড়ালেখার জন্য খুবই খুশি ও গর্বিত।

`গীতাঞ্জলী‘ চলচ্চিত্রের কথা বলুন…
আমি মোহনলাল চাচার সঙ্গে জুটি বেঁধে অভিনয় করিনি। আমি ছিলাম নিশান্থ এর জুটি। লাল চাচা ছিলেন কেন্দ্রীয় চরিত্রে। কিন্তু তার সঙ্গে আমার দৃশ্য ছিল। গীতাঞ্জলীতে আরও অনেক অভিজ্ঞ অভিনয়শিল্পী ছিলেন সীমা চাচী, সিদ্দিক, মধু স্যার প্রমুখ। আমি তাদের সঙ্গে প্রথম শট দিতে খুবই ভয় পাচ্ছিলাম, কারণ তাঁরা সবাই অভিজ্ঞ। যাইহোক, লাল চাচার সঙ্গে এটি হয়নি। কারণ ছোট থেকেই তাঁকে দেখে এসেছি। আমি জানি না, এত বড় অভিনেতার সঙ্গে কেন ভয় পাইনি। কিন্তু এটা সত্য তাঁর সঙ্গে অভিনয় করতে গিয়ে কোনো ভয় লাগেনি।
`ইধু এনা মায়াম‘ চলচ্চিত্রে কীভাবে কাজ পেলেন?
আমার প্রথম তামিল চলচ্চিত্র ইধু এনা মায়াম। চলচ্চিত্রটির প্রযোজক লিসটিন আমার বাবার বন্ধু। এ কারণেই আমাকে প্রস্তাব করা হয়। পরে পরিচালক বিজয় ত্রিবান্দ্রামে আমার সঙ্গে দেখা করেন। আমাকে চলচ্চিত্রটির অর্ধেক গল্প শোনান। পাশাপাশি প্রিয়ান চাচা বিজয়কে ফোন দিয়ে বলেন যে, আমি একজন ভালো অভিনেত্রী। আপনি জানেন যে, প্রিয়ান চাচার ছাত্র বিজয়। আমি চলচ্চিত্রটির জন্য চূড়ান্ত হই। আমি চেন্নাই আসার পর গল্পের বাকী অংশ শুনি। তারপরেই চলচ্চিত্রটির কাজ শুরু হয়।

বিক্রম প্রভুর সঙ্গে কাজ শুরু করলেন…
বিক্রম প্রভু খুবই গম্ভীর ও শান্ত। জানি না কেন? তিনি খুব কম কথা বলেন কিন্তু আমাকে খ্যাপাতে ছাড়েন না। তিনি খুবই মিষ্টি ও ভালো অভিনেতা। পর্দায় আমাদের খুবই সুন্দর রসায়ন ছিল। বিজয় স্যারকে সন্তুষ্ট করা কঠিন। প্রথম দিকে আমরা বিজয় স্যারের সঙ্গে কাজ করতে পারছিলাম না। তিনি আমাদের অভিনয়টা চেয়েছিলেন সাবলীল আবার আমাদের মতো করে। পরে আমরা দুজনে নিজেদের বেশ সময় দিই। ওই সময়টা খুবই সুন্দর ছিল। বিক্রম আমাকে খুব সাহায্য করেছে।

নিরব শাহ আপনার সেরা বন্ধু…
নিরব শাহ স্যারের সঙ্গে ইদু এনাম মায়াম চলচ্চিত্র শুটিংয়ের সেটে বন্ধুত্ব হয়। তিনি খুবই শান্ত প্রকৃতির।

বিজয় স্যার আপনাকে বেশি খাওয়া শিখিয়েছেন…
আমি, বিজয় স্যার, নিরব স্যার এবং কিছু সহকারী পরিচালক নিরামিশাষী ছিলাম। আমরা অনেক মজা করতাম। খাবার ছিল আমাদের অন্যতম আকর্ষণ। বিজয় স্যার আমাকে প্রচুর খাওয়াতেন এবং আমি বলতাম, ‘স্যার আমি আপনার নায়িকা। যদি বেশি খাই, আপনার জন্যই সমস্যা হবে।‘ কিন্তু তিনি বলতেন, ঠিক আছে, বেশি বেশি খাও।

আপনি শিবাকার্তিকায়ানের সঙ্গে মজা করতেন?
রাজিনী মুরুগান চলচ্চিত্রটি শুরু হলো ইদু এনা মায়াম শেষ হওয়ার পর। এই চলচ্চ্রিত্রটির শুটিংয়ে ব্যাপক মজা করেছি। এটা আমার কাছে সুবিধা ছিল যে, আমি তামিল ভাষা জানি। যখন শিবাকার্তিকায়্যান আমাকে খ্যাপাত আমিও বুদ্ধি দিয়ে উল্টো তাঁকে ক্ষ্যাপাতাম। সেখানে ছিলেন সুরি আনাও। সুরি ও শিবা দুজনইে দারুণ মজার। আমরা প্রত্যেককেই প্রত্যেকে ক্ষ্যাপাতাম।

শিবাকার্তিকায়ান নাকি খাওয়ার সময় শব্দ করতেন?

রাজিনি মুরুগান চলচ্চিত্রটি করার সময় তারা সবাই ছিল অ-নিরামিশাষী। আমি একা ছিলাম নিরামিশাষী। তাই আমার খাওয়ার সময় তারা সবাই আমার চারপাশো থাকতেন। আর আমাকে ক্ষ্যাপাতে নানা রকম শব্দ করতেন।

আপনার করা দুটি আলাদা চরিত্রের কথা বলুন
ইদু এনা মায়াম ও রাজিনী মুরুগান চলচ্চিত্র দুটির চরিত্র দুটিই আলাদা। ইদু এনা মায়াম চলচ্চিত্রে আমি শহরের খুবই সাধারণ, শান্তশিষ্ট, ভদ্র মেয়ে। নাম মায়া। চরিত্রটি খুবই সহজ কিন্তু গল্পটিতে ফুটিয়ে তোলা কঠিন ছিল। গল্প অনুযায়ী চরিত্রটিকে কীভাবে এগিয়ে নেব, তা নিয়ে প্রচুর ভাবতে হত।

আর রাজিনি মুরুগান একেবারেই আলাদা চরিত্র। আমি কার্তিকা দেবীর চরিত্রটি করি। ও খুবই স্মার্ট মেয়ে। আমার পাঁচ থেকে ছয় দিন লেগেছিল চরিত্রটি ধরতে। প্রথম দিকে আমি মায়ার মতোই ছিলাম। কারণ ওই চরিত্র থেকে বের হতে পারছিলাম না। আমি প্রথমবারের মতো এই চরিত্রে অভিনয় করি। দ্বিতীয় লটের শুটিংয়ে খুবই সহজ লাগে চরিত্রটি এবং আমি মজা পেতে শুরু করি।

যখন আপনার কাছে একটি স্ক্রিপ্ট আসে। স্ক্রিপ্ট বাছাই করতে বাবা-মা কি সাহায্য করে?
বাবা-মা আমাকে সাহায্য করে। আমি কখনোই শুধুই একজন নায়িকা হয়ে চলচ্চিত্রের একপাশে থাকতে চাই না। আমার চলচ্চিত্রটি নিয়ে কিছু একটা করা উচিত বলে মনে করি। তাই আমি এর গল্প, অভিনেতা, পরিচালক-সবকিছুর দিকে আমি লক্ষ রাখি।

আপনার মায়ের কোন চলচ্চিত্রটি আপনার পছন্দের? এবং কোনটি সেরা?
অপোল হলো মায়ের প্রথম মালায়ালাম চলচ্চিত্র। সেখানা মা খুবই ভালো করেছেন। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের জন্যও মনোনীত হয়েছিলেন। আমি পছন্দ করি তাঁর নেত্রিক্কান ও সাবিত্রি চলচ্চিত্র। তাঁর প্রথম তামিল চলচ্চিত্র রামাইয়া ভ্যাসুক্কু ভানদুত্তা আমার ভালো লাগে। আমার কাছে সাবিত্রি সেরা।

আপনি ফ্যাশন ডিজাইনে পড়েছেন। এটি অভিনয়ে কোনো সাহায্য করে?
অবশ্যই। অনেক সময়ই পোশাক পরিকল্পক দর্জির সঙ্গে ঠিকভাবে কাজ বোঝাতে পারে না। সেই অবস্থায় আমি সাহায্য করি। আমি গর্ব বোধ করি যে, আমার কাছে তারা সাহায্যের জন্য আসে। আমি পোশাক পরিকল্পকের সঙ্গে আমার ভাবনা ভাগাভাগি করি। এখন আমি পোশাক পরিকল্পনা করি না, কারণ হাতে সময় থাকে না।

আপনার কোনো স্বপ্নের চরিত্র আছে?
আমি ভবিষ্যত নিয়ে খুব একটা চিন্তা করি না। শুধু চলতে দাও। যা আমি পাই তাই করি। যখন একটি চরিত্র আমার কাছে আসে, তখন মনে হয় ও এরকম একটি চরিত্র আছে। আমি অবশ্য বলিউডের কুইন চলচ্চিত্রের কঙ্গনার চরিত্রটি পছন্দ করি। ভালো লাগে মার্যান চলচ্চিত্রের পার্বতীর করা চরিত্রটিও ভালো লাগে। এইসব চরিত্রগুলো আমার করার ইচ্ছা আছে। তার মানে এই নয় যে, এই চরিত্র কিংবা নির্দিষ্ট কোনো পরিচালকের সঙ্গে কাজ করার জন্য মুখিয়ে আছি। আমি শুধু স্রোতের সঙ্গে চলি।

সাক্ষাতকার: জোস্না ভবানিশঙ্কর
বিহাইন্ডউডস ডট কম থেকে অনূদিত