চলচ্চিত্র: আয়নাবাজি
পরিচালক: অমিতাভ রেজা
কলাকুশলী: চঞ্চল চৌধুরী, মাসুমা রহমান নাবিলা, পার্থ বড়ুয়া
দেশ: বাংলাদেশ
সাল: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৬
রেটিং: ৮.৬/১০
গল্প সংক্ষেপ
শরাফত করিম আয়না, পুরান ঢাকায় ছোটদের একটি নাটকের স্কুল চালায়, সেখানেই থাকে, সবাই জানে যে সে জাহাজে কুকের (বাবুর্চি) কাজ করে এবং সেকাজে মাঝেমধ্যে দুই-তিন মাসের জন্য চলে যায়। তবে আসলে সে এসময়ে কারাদণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধীদের হয়ে জেল খাটে আর স্থানীয় হলিউড স্টুডিওর পরিচালক গাউসুল তাকে অর্ডার এনে দেয়। ছবির প্রথমদিকে দেখা যায় নারী-নির্যাতন মামলার আসামী ব্যবসায়ী কুদ্দুস সিদ্দিকীর বদলী জেলখাটার জন্য লোক পেতে তার উকিল গাউসুলের সাথে যোগাযোগ করে, গাউসুল আয়নাকে জানায়। আয়না কুদ্দুসের সাথে দেখা করে এবং দ্রুত তার আচার-আচরণ রপ্ত করে ফেলে। আদালতে কারাদণ্ডাদেশ পেয়ে জেলে নেয়ার পথে পুলিশের যোগসাজশে কুদ্দুস ও আয়না বদলাবদলি করে; আয়না জেলে চলে যায় আর কুদ্দুস পার্টি করে বেড়ায় এবং রাতে গিয়ে মামলাকারী নির্যাতিত তানিশার বাড়ির সামনে গাড়ি নিয়ে ঘোরাঘুরিও করে। দৈনিক সকাল বেলা পত্রিকার রিপোর্টার সাবের হোসেন তানিশার সাক্ষাৎকার নিতে গেলে সে এসব জানায়, সাবের তখন খোঁজখবর নেয়া শুরু করে।
মামলার রায়ের সময় জেল থেকে কুদ্দুসরূপী আয়নাকে বের করে পথে আসল কুদ্দুসের সাথে বদল করে আদালতে নেয়া হয়; তাদের অনুসরণকারী সাবের এসব দেখতে পেলেও দুর্ভাগ্যক্রমে ছবি তুলতে ব্যর্থ হয়। মামলায় কুদ্দুস খালাস পায়, আয়নাও ঘরে ফেরে। নাটকস্কুলে গিয়ে তার চেনা-পরিচয় হয় তাদের মহল্লার নতুন প্রতিবেশী তরুণী হৃদির সাথে, আয়নার না-থাকা সময়টাতে সে ওখানে যাওয়া শুরু করেছিল। পরে আয়নার সাথে তার প্রায়ই পথে-বাজারে দেখা হয়, কথা হয়। এদিকে রিপোর্টার সাবের আয়নাকে খুঁজে বের করে জিজ্ঞাসাবাদ করে, আয়না কৌশলে সেসব এড়িয়ে যায়।
এরমধ্যে আয়না নতুন কাজ পায়, উচ্চবিত্ত পরিবারের এক পাগলাটে ছেলে তাদের ড্রাইভারের ছেলেকে খুন করেছে, আয়নাকে বদলী হাজতবাস করতে হবে। কিন্তু সাবের আয়নার বাড়ির সামনে ভোর থেকে অপেক্ষা করে পিছু নেয়ার জন্য। বিভিন্ন ছলেবলে আয়না তাকে এড়িয়ে জেলে চলে যায়, ফেরে কয়েক মাস পর। ফেরার পর হৃদি দেখা করতে এসে অনুযোগ করে, তাকে না বলে চলে যাবার জন্য। আয়না তাকে শোনায় সেবার কাম্পিয়ান সাগরে গিয়ে ঝড়ের কবলে পড়ার কাহিনী।
রিপোর্টারের পিছু নেয়াতে অতিষ্ঠ হয়ে আয়না বাসাবদল করে নদীর ওপারে গিয়ে থাকতে শুরু করে। বাসা খুঁজতে তাকে সাহায্য করে হৃদি। ধীরে ধীরে তাদের সম্পর্ক আরো ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠে। এরই মাঝে তারা ঠিক করে সিলেটে বেড়াতে যাবে; আয়নাও অপরাধ জগত থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু রওনা দেবার দিন সকালে নিজাম সাঈদের গুন্ডারা আয়নাকে ধরে নিয়ে যায়। রাজনীতিবিদ নিজাম সাঈদ চৌধুরী এক স্কুলশিক্ষককে খুন করেছে, এখন জেলে তার বদলী হিসেবে আয়নাকে পাঠাতে চায়, কিন্তু আয়না ওকাজ ছেড়ে দিয়েছে বলে জানায়। নিজাম অর্থ, অভিনয় প্রভৃতির প্রলোভন দেখায় এবং শেষে জোর করে তাকে কাজ করতে বাধ্য করে। ওদিকে স্টেশনে অপেক্ষা করছিল হৃদি, সিলেটের ট্রেন ছেড়ে যায়, আয়না আসে না, হৃদি ফিরে যায় ভাঙা মন নিয়ে। আয়না নিজাম সাঈদ চৌধুরী সেজে পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করে।
রিপোর্টার সাবের আয়নাকে পূর্বের ঠিকানায় না পেয়ে খোঁজাখবর নেয়া শুরু করে। এরমধ্যে আদালতে নিজামের ফাঁসীর রায় হয়। আসল নিজাম পালিয়ে যায়, আয়না পড়ে থাকে কারাগারে। নিজাম পরে গুন্ডা লাগিয়ে গাউসুলকে মেরে ফেলে যাতে করে আয়না তার আসল পরিচয় প্রমাণ করতে না পারে এবং সে-ই যেন ফাঁসিতে ঝোলে। রিপোর্টার সাবের এরিমধ্যে মহল্লার পুরির দোকানদার মজনুর কাছ থেকে আয়নার সব খবর জানতে পারে। হৃদির সাথে দেখা করে সে তাকে সব বলে। ততদিনে হৃদির বাবা স্ট্রোক করে মারা গেছেন। সাবের জানায়, বছর সাতেক আগে আয়নার মার চিকিৎসার জন্যে টাকা সংগ্রহ করতে আয়না প্রথম একাজে নেমেছিল, পরে মায়ের মৃত্যুর পরও অভিনয়ের টানে সে এই কাজ চালিয়ে গেছে। হৃদি জেলে গিয়ে আয়নার সাথে দেখা করে, ফিরে আসে কাঁদতে কাঁদতে। সাবের আয়নার খবর পত্রিকায় ছাপতে চাইলেও সম্পাদক তা প্রত্যাখ্যান করেন।
জেলে নিজামরূপী আয়নার সাথে মাঝেমধ্যে কথা হয় কারারক্ষী বুড়ো লাবু মিয়ার। সহমর্মী লাবু মিয়াকে আয়না একবার অভিনয় করতে প্রোরোচিত করে, নিজাম সাঈদ চৌধুরীর চরিত্রে অভিনয়। সরলমনা লাবু মিয়াকে নিজাম সাজিয়ে আয়না নিজে লাবু মিয়া সাজে, এবং জেল থেকে পালিয়ে যায়।
চলচ্চিত্রের শেষে কিছু খণ্ড দৃশ্যে দেখা যায় আয়না সাবেরকে ফোন করে আসল নিজামের ঠিকানা জানিয়ে দেয় এবং পুলিশও তাকে গ্রেফতার করে। শেষদৃশ্যে আয়না ও হৃদি তাদের শেখানো ছোটদের নাট্যাভিনয় তাসের দেশ দেখতে থাকে।
মূল কলাকুশলী
পরিচালক অমিতাভ রেজা
প্রযোজক  জিয়াউদ্দিন আদিল,. গাউসুল আলম শাওন
চিত্রনাট্যকার  গাউসুল আলম শাওন, অনম বিশ্বাস
কাহিনীকার গাউসুল আলম শাওন
সুরকার শায়ান চৌধুরী অর্ণব, হাবিব ওয়াহিদ, ফুয়াদ আল মুকতাদির, চিরকুট
আবহসঙ্গীত: ইন্দ্রদীপ দাশগুপ্ত
চিত্রগ্রাহক রাশেদ জামান
সম্পাদক ইকবাল কবির জুয়েল
প্রযোজনা
কোম্পানি কন্টেন্ট ম্যাটারস লিমিটেড, হাফ স্টপ ডাউন
অভিনয়শিল্পী
চঞ্চল চৌধুরী
মাসুমা রহমান নাবিলা
পার্থ বড়ুয়া
লুৎফর রহমান জর্জ
বৃন্দাবন দাশ
জামিল হোসেন
গাউসুল আলম শাওন
শরিফুল
ইফফাত তৃষা
সাউন্ডট্র্যাক
আয়নাবাজি চলচ্চিত্রের গানের সুর ও সঙ্গীত পরিচালনা করেছেন শায়ান চৌধুরী অর্ণব, ফুয়াদ আল মুকতাদির, হাবিব ওয়াহিদ ও চিরকুট ব্যান্ড।চলচ্চিত্রের থিম সং তৈরি করে চিরকুট। গানগুলোর কথা লিখেছেন অনম বিশ্বাস ও অমিতাভ রেজা চৌধুরী। আবহসংগীতের দায়িত্বে ছিলেন ইন্দ্রদীপ দাশগুপ্ত এবং রিপন নাথ। ছবি মুক্তির আগে প্রাক-প্রচারণা হিসেবে ইউটিউব শান ও হাবিবের গানদুটির অডিও সংস্করণ এবং অর্ণব ও চিরকুটের করা গানদুটোর মিউজিক ভিডিও প্রকাশ করা হয়।
মুক্তি
আয়নাবাজি চলচ্চিত্রটি ২০১৬ সালের ১৭ মে কান চলচ্চিত্র উৎসবের মার্শে দ্যু ফিল্ম বা বানিজ্যিক চলচ্চিত্র বিভাগে প্রদর্শিত হয়। বাংলাদেশে ছবির প্রযোজকরা আগস্ট মাসের যেকোনো শুক্রবারে ছবিটি মুক্তি দিতে চাইলেও সারাদেশে বন্যাদুর্গত পরিস্থিতির কারণে তা পিছিয়ে দেয়া হয়। আনুষ্ঠানিকভাবে ৩০ সেপ্টেম্বর ঢাকা ও আরো কয়েক জেলার ২০টি প্রেক্ষাগৃহে ছবিটি মুক্তি পায়।পরবর্তীতে চট্টগ্রাম ও রাজশাহীসহ বিভিন্ন জেলার মোট ৭৫টি হলে তা প্রদর্শিত হয়। পরীক্ষামূলকভাবে সিরাজগঞ্জ (চালা), খুলনা, রংপুর প্রভৃতি স্থানে এক-দুটি হলেও ছবিটি প্রদর্শিত হয়। এদিকে রবি অনলাইন টিভিতে ছবিটি ছাড়ার পর তা পাইরেসির শিকার হয়।
পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রের ১১তম সিয়াটল সাউথ এশিয়ান ফিল্ম ফেস্টিভালে আয়নাবাজি অংশগ্রহণ করে এবং সেরা চলচ্চিত্রের পুরস্কার জিতে নেয়। নভেম্বর মাসের ১২ থেকে ১৫ তারিখ মানহেইম-হেইডেলবের্গ আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ছবিটির ৪টি প্রদর্শনী হয়। বহির্বিশ্বে ফেস্টিভালের পাশাপাশি বাণিজ্যিকভাবেও ছবিটি মুক্তি দেয়া হয়, যার লক্ষ্য ছিল মূলত প্রবাসী বাংলাদেশি ও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র পরিবেশকগণ। ১৮ নভেম্বর ২০১৬ তারিখে ফ্রান্সের প্যারিসে ছবিটি মুক্তি দেয়া হয়। একই দিনে কানাডায় মুক্তি পেয়ে ছবিটি তিন সপ্তাহ চলে। ১৪ অক্টোবর ২০১৭ তারিখে আমেরিকার সিয়াটলে শুরু হয় ‘সিয়াটল দক্ষিণ এশীয় চলচ্চিত্র উৎসব’। সেখানে উদ্বোধনী দিনে প্রদর্শিত হয় ছবিটি। অস্ট্রেলিয়ায় সিডনিতে ২৬ নভেম্বর ছবিটি প্রথম প্রদর্শিত হয়, পরে আরো পাঁচটি শহরে তা দেখানোর পরিকল্পনা জানান ছবিটির প্রযোজক জিয়াউদ্দিন আদিল। এছাড়া সীমিতভাবে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক, শিকাগো, সান ফ্রান্সিসকো প্রভৃতি শহরে এবং যুক্তরাজ্য লন্ডনের প্রেক্ষাগৃহেও ছবিটি প্রদর্শিত হয়েছে।
অমিতাভ রেজা পরিচালিত ব্লকবাস্টার হিট ‘আয়নাবাজি’ সিনেমাটি আবারও মুক্তি পেতে যাচ্ছে ঢাকার প্রেক্ষাগৃহে। ২০১৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর মুক্তি পেয়ে ঢালিউডে ইতিহাস গড়ে ‘আয়নাবাজি’। দেশে-বিদেশে সমানভাবেই সুনাম কুড়িয়েছে সিনেমাটি। শুক্রবার (২রা ফেব্রুয়ারি ২০১৮) থেকে এই দুটি হলে আবার ‘আয়নাবাজি’ প্রদর্শিত হবে।
পুরস্কার
শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র পরিচালক (মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কার)
শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র অভিনেত্রী (মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কার)
শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র অভিনেতা (সমালোচক) (মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কার)
সেরা চলচ্চিত্র (১১তম সিয়াটল সাউথ এশিয়ান ফিল্ম ফেস্টিভাল )
সেরা ছবি (১৬তম টেলিসিনে পুরস্কার )
অন্যান্য তথ্যাবলী
উৎপাদন: কন্টেন্ট ম্যাটারস লিমিটেড, হাফ স্টপ ডাউন
জেনারেল: রিয়ালিটি ফিকশন (অ্যাডভেঞ্চার)
দেশ: বাংলাদেশ
সময়কাল: ১৪৭ মিনিট।
ফরম্যাট: ডিজিটাল
রং: রঙিন
মুক্তি: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৬
দেশ: বাংলাদেশ
ভাষা: বাংলা
নির্মাণব্যয়: ৳১.৭০ কোটি
আয়: ৬.৩৩ কোটি টাকা। ৳২.১৩ কোটি (দুই সপ্তাহে)