চলচ্চিত্র : কে জি এফ (কোলার গোল্ড ফিল্ডস) চ্যাপ্টার ওয়ান

পরিচালক : প্রশান্ত নীল

কলাকুশলী: যশ, স্রিনিধী, অনন্ত নাগ, রামচন্দ্র, মালবিকা

দেশ: ভারত

সাল: ২০১৮

রেটিং : ৩.৫/৫

 

প্রাককথা
কর্ণাটকের কন্নড় ভাষার এই ইণ্ডাস্ট্রির নাম তেমন একটা শোনা যায় না। বলিউডের বড় বড় বাজেট আর তারকাদের ভীড়ে দারুণ কিছু গল্প আর নির্মাণ নিয়েও পিছিয়েই থাকে এটি। ব্যবসায় এদের ভরসা যতটা না ভারতকেন্দ্রীক তার চেয়েও বেশি শুধু তাদের অঞ্চলভিত্তিক হয়ে থাকে। বাহুবলী বা রোবট গত কয়েক বছরে বলিউডকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে যেভাবে ব্যবসা করেছে, তাতে দক্ষিণের প্রায় সব ইণ্ডাস্ট্রিতেই লেগেছে বড় বাজেট নেবার সাহস আর সিক্যুয়েল নির্মাণের হিড়িক। কারণ সীমা পেরোনোর এই সময়ে ছবি মুক্তি পাচ্ছে সারা বিশ্বে, সেটাও খোদ বলিউডের হাত ধরেই।
বাহুবলীর দ্বিতীয় পর্বের লাভ যে করণ জোহরের ধর্ম প্রোডাকশনের বিশাল অবদানে এসেছে সেটা যে কেউ জানে। এত বকবক করার কারণ, গত বছরে যে ছবিটি বড়দিনে শাহরুখের ‘জিরো‘ ছবির মুখোমুখি দাড়িয়ে পরের সপ্তাহেই ‘সিম্বা‘র সাথেও হিন্দী ভার্সনে বাজার দখল করে ব্যবসা করে গেছে তার নাম ‘কেজিএফ‘।
মুক্তি নিয়ে অনেক বিপত্তি আর বক্স অফিসে ক্ষতির আশঙ্কার পরেও এ ছবির হিন্দি ডাবিংয়ের মুক্তিতে হাত বাড়িয়ে দিয়েছে ফারহান আখতারের এক্সেল এন্টারটেইনমেন্ট আর অনিল থারানির এ এ ফিল্মস এর মতো বড়ে দুটি প্রতিষ্ঠান। ভারতে ২ হাজার ৪৬০ পর্দায় মুক্তি পায় কেজিএফ। এর মধ্যে ১ হাজার ৫০০ পর্দায় হিন্দিতে, ৪০০ পর্দায় কন্নড় ভাষায়, তেলেগু ভাষায় ৪০০ পর্দায়, তামিল ভাষায় ১০০ পর্দায় এবং ৬০ পর্দায় মালায়ালাম ভাষায় সিনেমাটি মুক্তি পায়। দর্শক ও সমালোচকদের কাছ থেকেও প্রশংসা পায় এটি। যার ফলাফল প্রথম কন্নড় ছবি হিসেবে ২৫০ কোটি পার হয়ে যাওয়া। ছবিটির ডিজিটাল কনটেন্ট কিনে নিয়েছে অ্যামাজন প্রাইম। অভিনেতা যশের ঠিক আগের ছবিটির নাম ‘মাস্টারপিস‘, যদিও টেনেটুনে ছবিটি কোনরকম লাভের মুখ দেখেছে। তবে এবার তার অনবদ্য অভিনয়ে ‘কেজিএফ‘ শুধু ব্যবসায় নয়, কাহিনি বলার ধরনেও যে মাস্টারপিস সংযোজন সেটা আমি সিনেমা দেখার ক্ষুদ্র অভিজ্ঞতা থেকেই দাবি করি।

গল্প
কোলার ভারতের কর্ণাটকের একটি জেলার নাম। ব্যাঙ্গালোরু থেকে এর দুরত্ব প্রায় একশ কি. মি। সেখানে আবিষ্কৃত সোনার খনিটি ঘিরে প্রধানত দুটি পরিবারের মালিকানা আর অনেক রাজনৈতিক হিসাব নিকাশ জড়িয়ে আছে। তাই ২০০১ সালে এটি বন্ধ হয়ে গেলেও মানুষের মনে সোনার খনিটি ঘিরে সেসব মাফিয়া বা দখলের হিংস্রতা শোনা যায়। এটাই ছবির গল্পের পটভূমি।

ছবির প্লট গড়ে ওঠেছে মুম্বাইয়ে রকি নামের এক মাফিয়ার বেড়ে উঠা, তার দাপট আর সমকালীন রাজনীতির আড়ালে কেজিএফের দখলদারিত্বের লড়াই নিয়ে। প্রথম দিকে শুধু রকির বেড়ে উঠা আর মাফিয়াদের পরিচয় দেখানো হয়েছে, পরের দিকে কেজিএফে রকির প্রবেশ ও সেখানকার নির্মম পরিস্থিতি দেখানো হয়। তবে সিক্যুয়েল ছবি বিধায় এখানে অনন্ত নাগের মৌখিক বর্ণনায় পুরো ঘটনা দুই ধাপে দেখানো হবে, যার প্রথম ধাপ ছিল এটি। অনন্ত এখানে ‘এল দেরাদো‘ নামের বইয়ের লেখক, যে বইটি রকি ও তৎকালীন রাজনীতি নিয়ে লেখা বলে সরকার নিষিদ্ধ করে পুড়িয়ে দেয়।
১৯৮১ সালে প্রধানমন্ত্রী সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দেন ভারতের সবচেয়ে কুখ্যাত অপরাধী রকিকে ধরতে। তাই রকির প্রতি লেখকের এমন ভাবনার কারণ জানতে কড়া সাংবাদিক দীপা সাক্ষাতকারে আনেন তাকে। নিজের মায়ের কষ্টকর মৃত্যু রামকৃষ্ণকে ঠেলে দেয় ক্ষমতার লড়াই আর এলাকায় দাপট সৃষ্টিতে, ধীরে ধীরে রামকৃষ্ণ নামের বাচ্চা ছেলেটি হয়ে উঠে রকি। এক পর্যায়ে চরম মাত্রায় সাহসী ও দূরদর্শী রকি নজরে আসে ব্যাঙ্গালোরের ডনের। একটি বড় কাজের প্রস্তাব আসে রকির জন্য, যা করতে পারলে মুম্বাই হয়ে যাবে শুধুই তার। কিন্তু কী সেই কাজ তা আগেই তাকে জানানো হয় না। রকি রাজি হয় আন্ডারওয়ার্ল্ডের বিশাল সাগরের গভীরতা জানতে। কেজিএফ এর নিয়ন্ত্রণ যে পাঁচজনের হাতে থাকে তার একজন রাজেন্দ্র দেশাই। ব্যাঙ্গালোর গিয়েই রকি প্রেমে পড়ে তার মেয়ে রিনার। রিনা রকিকে চিনতে ভুল করে একজন সাধারণ হিসেবে, কিন্তু ক্রমেই টের পায় শক্তিধর রকির রয়েছে শক্তি আর মনুষ্যত্ব দুটোর মিশেলে একজন প্রেমিক মানুষ।
রাজেন্দ্র দেশাই জানায় রকিকে এখানে আনা হয়েছে একজন কে হত্যা করতে, যে কেজিএফের নিয়ন্ত্রক সূর্যবর্ধনের ছেলে গারুদা। গারুদাকে কেউ মারার সাহস তো দূরের কথা নাম শুনলেই কোন কিলার আসতে চায় না ধারে কাছে, তাই রকিকে আসার পর জানানো হয়। রকি একটা ছক আকে মারার, কিন্তু সামনে পেয়েও সে মারতে পারে না। তাই মায়ের মৃত্যুতে ক্ষমতার প্রয়োজন হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া রকি বুঝতে পারে এই চ্যালেঞ্জটিই তাকে সেই ক্ষমতা এনে দিতে পারে। সে কেজিএফে গিয়েই গারুদাকে মারার কাজ হাতে নেয়, কিন্তু কেজিএফ হল নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা আর ভয়ংকর বাহিনী দ্বারা আবিষ্ট এলাকা। রকি তখনো জানতো না কেজিএফের কি নির্মমতা আর জটিলতা তার জন্য অপেক্ষা করছে। সিনেমার পরের ভাগ এই কেজিএফ এর ভেতরের জনজীবন নিয়েই আর দেখতে হবে গারুদার পরিণতি।

অভিনয়
যশ এই ছবির নায়ক এবং একচ্ছত্র কেন্দ্রীয় চরিত্র। তার প্রভাব এতটাই বাকিরা শুধু তাকে কেন্দ্র করে ঘুরেছে কাহিনির প্রয়োজনে। এমনকি তার প্রেমিকা স্রিনিধীকেও খুব বাজিয়ে দেখা হয়নি। যশ তার দৈহিক ও মানসিক অনুভূতির মিশেলে বারবার যেন বাহুবলীকেই মনে করিয়ে দিচ্ছিলো। অনন্ত নাগ ইন্ডাস্ট্রির পুরনো অভিনেতা, তার বর্ণনা ছিল খুব শ্রুতিমধুর। প্রতিটি ডন চরিত্রের অভিনেতাদের চেহারা ও চরিত্র অনুযায়ী অভিনয় ছিল ঠিকঠাক। রকির মায়ের ভুমিকায় দারুণ মমত্ব প্রকাশ পেয়েছে, ছিল গারুদার চরিত্রের ভয়ংকর বিন্যাস।

পরিচালনা
পরিচালক প্রশান্ত নীল এর আগে মাত্র একটি সিনেমা বানিয়েছেন, ‘ওগ্রাম‘। সেটাও বাজেটের পাঁচগুনের কাছাকাছি টাকা ঘরে তুলেছে। তার চেয়েও বড় কথা তার একটি বড় মার্জিনে গল্প বলার আগ্রহ সেখানে বোঝা যায়নি। তাই কেজিএফ এখন পর্যন্ত যা দেখালো তাতে প্রশান্ত নিজেকে নিজেই বিরাট লাফে ছাপিয়ে গেছেন বলাই যায়। ক্যামেরার শট বিশেষ করে পঞ্চাশ থেকে সত্তরের দশকের সেট নিয়ে কাজ করার দারুণ মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন।
সম্পাদনা
এই ছবির শক্তিশালী দিক খুব গতিশীল এডিটিং। দশ সেকেণ্ডও এখানে মুষড়ে যাবার জো নেই। প্রতিটি দৃশ্যে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে চরিত্র নির্মাণ আর কাহিনী এগিয়ে নেবার শক্তি। তাই বলাই যায় সম্পাদনা বাজেট অনুযায়ী ভালভাবে পাশ করে গেছে।
 
সংগীত
সিনেমার গল্প আর বিন্যাস এত গতিশীল ছিল যে গানের তেমন দরকার ছিল না মনে হয়, তবু আবহ সংগীত আর দুইটি গান ছিল মানানসই।
চিত্রগ্রহণ
সিনেমার ক্লোজ, এঙ্গেল, ড্রোন, ওয়াইড প্রায় সব ধরনের ক্যামেরা কাজ লক্ষ্য করা গেছে। বিশেষ করে কেজিএফের ভেতরের বিভিন্ন শট আর রকিকে মধ্যমণি করে নেওয়া বিভিন্ন শট গল্পের সাথে ছড়িয়েছে উত্তেজনা।
সেট ডিজাইন
ব্যক্তিগতভাবে সিনেমার ট্রেলারেই এর সেট ডিজাইন দেখে ভাল লেগেছিল। তার উপর এখন অপেক্ষা চ্যাপ্টার দুইয়ে কী থাকছে তা জানার। গোল্ড ফিল্ডের সেট আর রকির বেড়ে উঠা সময়কালীন পারিপার্শ্বিকতা বোঝাতে খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে সেট।
দুর্বলতা
কেজিএফ কান্নাড়া বাজারের বিচারে যথেষ্ট বাজেটের হলেও বলিউড কিংবা আন্তর্জাতিক বাজারে এখনো কম বাজেটের ছবি এটি। ফলে ভিএফএক্স আর সেট ডিজাইনে সেটার প্রভাব চোখে পড়েছে। অভিনয়ে যশ বাদে বাকিদের তেমন একটা উপস্থিতি ছিল না। স্রিনিধীর অভিনয় আহামরি ছিল না।
শেষকথা
সিক্যুয়েল আর বড় কলেবরের গল্প বলার যে হাওয়া দক্ষিণের ছবিতে লেগেছে তাতে ভালভাবেই দর্শকপ্রিয়তা পাচ্ছে কোলার গোল্ড ফিল্ডস। আশা করি চ্যাপ্টার দুইয়েও এই প্রবাহ বাড়বে।