চলচ্চিত্র: কমলা রকেট
পরিচালক: নুর ইমরান মিঠু
কলাকুশলী: তৌকির আহমেদ, মোশাররফ করিম, জয়রাজ, সামিয়া সাঈদ প্রমুখ।
দেশ: বাংলাদেশ
সাল: ২০১৮
রেটিং: ৩.৫/৫

 

রিভিউ দিচ্ছি না, ছবি দেখে ভাবনাটা ভাগ করে নিচ্ছি। একদিকে মৃত গার্মেন্টস কর্মীর লাশ নিয়ে তার স্বামী অপেক্ষায়, কখন পৌছাবে বাড়ি, একদিকে আগুনে পোড়া গার্মেন্টসের ব্যবসায়ী অপেক্ষায় কখন সে মুক্তি পাবে মিডিয়া আর আহাজারি থেকে, ঠিক আরেকদিকে আরেকটি পরিবার অপেক্ষায় অবিশ্বাস আর টাকার পেছনে ছোটার ফাঁকে আসা এই ভ্রমণের শেষ কবে। নূর ইমরান মিঠু তার প্রথম চলচ্চিত্রেই ধাক্কা দিয়েছেন আমাদের দেশীয় সমাজব্যবস্থার কয়েকটি শ্রেণীকে একসাথে।
‘কমলা রকেট‘ জনরার দিক থেকে বলতে গেলে সামাজিক ড্রামা ফিল্ম। জীবনবোধ আর মানবিকতা নিয়ে বরাবরই লিখে গেছেন কথাসাহিত্যিক শাহাদুজ্জামান । তার ‘মৌলিক’ ও ‘সাইপ্রাস’ নামের দুটি গল্প অবলম্বনে ‘কমলা রকেট’-এর চিত্রনাট্য করেছেন শাহাদুজ্জামান ও মিঠু নিজেই। মিঠুর বড় পর্দার সূচনাটা ছিল চমকানো। মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ‘পিপড়াবিদ্যা‘র সেই অভিনেতা মিঠু তার পরিচালনা আর গল্প নির্বাচনেও রেখেছেন মানসিক অবস্থিতির ছাপ। তাই কমলা রকেট শেষ হয়ে গেলেও শেষ দৃশ্যের লাশের গন্ধ দর্শকদের আরো কিছুক্ষণ অস্বস্তিতে রাখতেই পারে।
ছবির গল্পে দেখা গেছে ‘কমলা রকেট’ মূলত একটি স্টিমারের নাম। এই স্টিমারটির গল্পই বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করছে বিশ্বব্যাপী। রকেট নামের একটি স্টিমারের যাত্রীদের নিয়েই তৈরি হয়েছে ছবিটা, সেই রকেটের রং কমলা, তাই ছবির নাম The Orange Ship। ছবিতে দেখা যাবে, রকেটের নিয়মিত সব যাত্রীর সঙ্গে উঠে পড়েছে এক ফার্স্ট ক্লাস যাত্রী আতিক। ব্যবসায়ী আতিক নিজের কারখানায় আগুন লাগিয়ে দেয় ইনস্যুরেন্স কোম্পানি থেকে টাকা পাওয়ার জন্য। আগুন লাগার ঘটনা যখন সারা দেশের মূল খবরে পরিণত হয় তখন সে মংলায় বন্ধুর বাসায় আত্মগোপন করার জন্য স্টিমারে ওঠে। অন্যদিকে কারখানার আগুনে পোড়া এক নারী কর্মীর লাশ নিয়ে স্বামী মনসুরও একই স্টিমারের যাত্রী হয়। এদের পাশাপাশি রয়েছে মোশাররফ করিমের ‘দালাল‘ চরিত্রটির একটি সরব উপস্থিতি। কেননা, বই বিক্রির ব্যবসায় লসে পড়া এই লোকটি কেন ধীরে ধীরে ঢুকে গেছে নারীর শরীরের বিপণনে তা অকপটে বলার দুঃসাহস আরও জীবন্ত ও প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলে ধরেছে চোখের সামনে পর্দায়।
আতিক বুর্জোয়া শোসক শ্রেণীকে তুলে ধরেছে তার পলাতক চরিত্র দিয়ে। এই পালানো শুধু গার্মেন্টস পুড়ে গেছে বলে লোকচক্ষুর আড়ালে গা ঢাকা দেয়া নয়, একইসাথে নিজের অমানবিক চেহারাকে মিডিয়া থেকেও আড়াল করা। সাম্প্রতিক সময়ে নিজের লসে যাওয়া প্রতিষ্ঠান নিজে পুড়িয়ে দিয়ে দেউলিয়া ঘোষণা দিয়ে বীমার টাকা আদায় করার অমানবিক রীতি অলিখিতভাবে চালু হয়েছে, তাদের প্রতিনিধি হয়ে আতিককে দেখা যায় দারিদ্র্য শ্রেণীর পোড়া মাংসের উপর দাড়িয়ে মানবতাকে বুড়ো আঙুল দেখাতে। তবে এই আতিককেই শেষে হাঁটুগেড়ে বমি করতে দেখা গেছে মৃত লাশের গন্ধে, যে গন্ধ শুধু আতিকের মতো সুবিধাবাদীদের জন্য নয়, সমাজের বুর্জোয়া শ্রেণীর জন্যও অস্বস্তির গন্ধ।
সিনেমায় একটি পরিবারকে দেখানো হয়েছে, যেখানে স্বামী, স্ত্রী, সন্তানের সাথে রয়েছে স্ত্রীর ছোটবোন। এই পরিবারের কর্তা সমাজের উঠতি ধনী লোকদের একটি অংশকে পর্দায় এনেছেন তার বিরক্তিকর আচরণের মাধ্যমে, একইসাথে পরকীয়াকে প্রকাশ করা হয়েছে সেই পরিবারটির বিশ্বাসের চিড় হিসেবে। বাইরে থেকে আমরা চারপাশের এই পরিবারগুলোর মনোকষ্ট আর বিশ্বাসহীনতা এক প্রকার দেখতে পাই না বললেই চলে। সব জেনেও স্বামীর এই আচরণ অনেকদিন সহ্য করে থাকা স্ত্রীকে এক সময় বাধ্য করে মুখ খুলতে। স্ত্রীর ছোট বোনকে হালের ফ্যাশন সচেতন এবং বয়ফ্রেন্ডের চাহিদার পাত্র হিসেবে দেখানো হয়েছে খুব সযতনে, যেখানে রক্ষণাত্মক দর্শকের বোঝার অসুবিধা হয় না সেই প্রেমিকের ছল। এর বাইরে সরকারী চাকরীর অপেক্ষায় থাকা এই মেয়েটির আরেকটি পরিচয় সে মানবাধিকার নিয়ে কাজ করে, যেখানে আতিকের সাথে কথোপকথোনে বারবার সে অজান্তে আতিককে ফেলে অস্বস্তিতে। এই অস্বস্তি এই পরিবারটির সাথে আতিকের সাধারণ যাত্রীদের ভাল সম্পর্কটুকুও হতে দেয় না।
স্টিমারের নিম্নভাগই আমাদের দেশীয় বৃহৎ জনগোষ্ঠীর প্রতীক হয়ে ধরা দিয়েছে। এখানে একই সাথে যাদু আর সার্কাসের খেলোয়ারদের সাথে রয়েছে বেকার যুবক আর অবিবাহিত ফ্যান্টাসীতে ভোগা যুবশ্রেণী। তাদের কাছে নিজের মোলায়েম উপস্থিতি মোশাররফ করিমের দালাল চরিত্রটিকে করেছে সরব। অন্যদিকে তার নিজেরও রয়েছে গুরুভক্তি আর বন্ধুর প্রতি মমত্ববোধ। আতিকের প্রতি সম্মানসূচক দরদও দেখা গেছে সিনেমার শেষদিকের খাবার সংকটের সময় । সমান্তরালভাবে সিনেমায় এগিয়ে গেছে, স্ত্রীর লাশের পাশে অপেক্ষমাণ পুত্রের কথা ভেবে মনসুরের আর্তনাদ আর উপরের শ্রেণীর তথাকথিত বিলাসভ্রমণের আড়ালে হাঁপিয়ে উঠা সুখ খোঁজার জীবন।
কাহিনী আমাদের খুব পরিচিত তবে প্রকাশভঙ্গি যথেষ্ট নতুনত্ব নিয়ে করা। একটি স্টিমারে পুরো শুটিং করায় এর সিনেমাটোগ্রাফির ব্যাপ্তি খুব চ্যালেঞ্জিং ছিল বোঝাই যায়, তবু লংশটে নদী তীরের আশপাশের কিছু কাজ ছিল দারুণ। বাঘা বাঘা অভিনেতা হিসেবে তৌকির আহমেদ., মোশাররফ করিম কিংবা জয়রাজের অভিনয় ছিল স্বভাবসুলভ ও চরিত্রের সাথে মানানসই। তবে বাকিরা তাদের অভিজ্ঞতার সন্নিবেশ কম থাকায় দুর্বল ও মেকি লেগেছে অনেক জায়গায়। ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক ছিল গল্পের ধীরতার সাথে যুতসই।
‘কমলা রকেট‘ ভারতের চেন্নাইয়ে ‘১৬তম চেন্নাই আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব’, মুম্বাইয়ে অনুষ্ঠিতব্য ১৭তম থার্ড আই এশিয়ান ফিল্ম ফেস্টিভালেও প্রদর্শিত হয়। গত অক্টোবরে শ্রীলঙ্কায় ‘জাফনা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব’-এ ‘কমলা রকেট’ ‘বেস্ট ডেব্যু ডিরেক্টর’-এর পুরস্কার অর্জনের পাশাপাশি বেশ প্রশংসিতও হয়েছে। এরপর নভেম্বরে গোয়া ফিল্ম ফেস্টেভ্যালেও ছবিটি খুব প্রশংসিত হয়েছে। সর্বশেষ ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব ২০১৯ এ বাংলাদেশ প্যানারোমা বিভাগে প্রদর্শিত হয় ছবিটি।
তৌকির আহমেদ, মোশাররফ করিম ছাড়াও এ ছবিতে আরও অভিনয় করেছেন জয়রাজ, সামিয়া সাঈদ, সেউতি, ডমিনিক গোমেজ, বাপ্পা শান্তনু, সুজাত শিমুল, শহীদুল্লাহ সবুজ, আবু রায়হান রাসেল প্রমুখ।