চলচ্চিত্র: ফাগুন হাওয়ায়
পরিচালক: তৌকির আহমেদ
কলাকুশলী: সিয়াম আহমেদ, নুসরাত ইমরোজ তিশা, যশপাল শর্মা, আবুল হায়াত, ফজলুর রহমান বাবু, সাজু খাদেম।
দেশ: বাংলাদেশ
সাল: ২০১৯
রেটিং: ৩/৫

 

বাংলার ছবি কেমন হবে? নদী, খাল, ফুল, পাখি, ধান ক্ষেত, মাঠ, ঘাট থাকবে। থাকবে ছোট ছোট সুখ। বাতাসে উড়ে আসা কষ্ট। এর সবই থাকে তৌকির আহমেদের সিনেমায়। সিনেমাটা আমার আমার মনে হয়। তাই এই সিনেমা অনেক বেশি বেশি দরকার। আমাদের অনুভূতি দেখতে, শুনতে, বুঝতে। যদিও কখনো কখনো সিনেমাটা ঠিক সিনেমা হয়ে ওঠার প্রশ্নে আটকে যায়। ফাগুন হাওয়ায় তেমনি আমাদের অনুভূতির আটকে যাওয়া এক সিনেমা।
সবে মুক্তি পেয়েছে হলে। বড় পর্দায় সিনেমা দেখার একটা অন্য মাত্রা আছে। তাঁর কারণ অনলাইন স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে ঘরে বসে সিনেমা দেখলে কেবল সিনেমা দেখাই হয়। আর সিনেমা হলে দেখলে পাশের সিটে বসা দর্শকের অনুভূতি দেখা যায়, উল্লাস দেখা যায়। ফাগুন হাওয়ায় নিয়ে আমার মতামতের পাশাপাশি বলব সিনেমা হল জুড়ে দু একটা উল্লাসের কথাও।

স্টার সিনেপ্লেক্সের পাঁচটার প্রদর্শনীর টিকিট কাটা আমাদের। সিনেমা হলের আলো আঁধারিতে ঢুকতে মোবাইলের আলো জ্বালি। আমার জন্য নয়, পরিবারসহ সিনেমাটি দেখতে এসেছেন কেউ। তাঁদের সঙ্গে আছে ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধ। সহজে অন্ধকার সিড়ি মাড়িয়ে উঠতে পারছেন না। বৃদ্ধরা কেন দেখতে এসেছেন এই ছবি? তার উত্তর হতে পারে সিনেমাটির প্রেক্ষাপট টেনে এনেছে তাঁকে সিনেমা হলে। ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে তৈরি সিনেমাটি। হয়তো তিনি কিছুক্ষণের জন্য হলেও ফিরে যেতে চেয়েছিলেন সেই সময়ে। তৌকির কী সেই ১৯৫২ সালকে ২০১৯ সালে এসে পুর্ননির্মাণ করতে পেরেছেন? আমি বলব, না। বায়ান্নর আবহ ঠিক ততটা চোখে লাগেনি। মনে হয়েছে এই সময়েই যেন ধরা দিয়েছে সিনেমাটিতে। কেবল ৫২ কে ধরার একটা কৌশল করা হয়েছে টেকনিক্যাললি।
সেটের অপ্রতুলতা, সেই সময়কে ভালোভাবে বুঝতে পারার সক্ষমতা, পর্যাপ্ত গবেষণার অভাব মনে হয়েছে। একটা সিনেমা তো আর চিত্রনাট্য দিয়েই তৈরি হয় না। তার পেছনে অনেক গবেষণা থাকতে হয়। মূল নির্যাসকে তুলে আনতে। ফাগুন হাওয়ায় সেই গবেষণা দল ছিল কি না আমার জানা নেই। থাকলেও তাদের গবেষণা খুব একটা ফলপ্রসু নয়। তাই তো তারা লিয়াকত, জিন্নাহ আর খাজা নাজিমুদ্দিন এর সঙ্গে মহাকবি ইকবালকেও গুলিয়ে ফেলেন নির্দিধায়।

ছবির গল্প খুবই সহজ। ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে এক তরুণ তরুণীর প্রেম। তবে এই সিনেমাতে শুধু তরুণ তরুণীর প্রেমই উঠে আসেনি, আবার শুধু ভাষা আন্দোলনও মোটা দাগে বলে যায়নি। দুটিই এগিয়েছে সমান্তরাল। গল্প বলার এই মুন্সিয়ানার জন্য পরিচালক ও তার দল অবশ্যই ধন্যবাদ পাওয়ার দাবিদার। এই ঘরানার সিনেমাগুলোতে মোটা দাগে সিনেমার ম্যাসেজ বলার জন্য গল্পটা অনেক বেশি বিরক্তিকর হয়ে যায়। মনে হয় ম্যাসেজ দেওয়াটাই পরিচালকের উদ্দেশ্য ছিল। কিন্তু ফাগুন হাওয়ায় এর ব্যতিক্রম। এটি তাই ম্যাসেজ ভিত্তিক সিনেমা না হয়ে সিনেমা হয়ে ওঠার একটা প্রবল প্রবণতা ভিত্তিক সিনেমা হয়ে ওঠে।
তবে শেষ পর্যন্ত আমার কাছে সিনেমাটি সিনেমা হয়ে ওঠতে পারে না। কারণ সিনেমার ভাষাটাই যেন ধরে ওঠতে পারেনি। কিছুটা মঞ্চনাটকের প্রভাব, টেলিছবির আবেগ ও নাটকের এলোপাতাড়ি ভাঁড়ামো দিতে গিয়ে সিনেমার গভীরতায় আঘাত হেনেছেন পরিচালক। আমার পাশের সিটে বসা একজন দর্শক বলতেছিলেন। এই পরিচালকগুলো টেলিফিল্মগুলোকে সিনেমায় নিয়ে আসছেন। হয়তো তার কথা অযৌক্তিক নয়। বড় পর্দায় দেখালেই তো সিনেমা হয় না। সিনেমার একটা ভাষা আছে। আমরা তার বিশ্লেষণ বা সংজ্ঞায়ন না করতে পারলেও ঠিক ধরতে পারি।

সিনেমার অন্যান্য দিকগুলোর কথা বলব না। শুধু অভিনয়ের কথা বলব। অভিনয়ে কামাল করে দিয়েছেন বলিউডের অভিজ্ঞ যশপাল শর্মা। আর আমাদের অভিনেতাদের মধ্যে ফজলুর রহমান বাবু, সাজু খাদেম, আবুল কালাম আজাদ সেতু, আবুল হায়াত, পঙ্কজ মজুমদারের কথা বলা যায়। সিয়াম যেন ১৯৫২ সালকে ধরতে গিয়ে একটু জড়সড় হয়ে গেছিলেন। তিশা চালিয়ে নিয়েছেন। তবে একটা কথা বললেই নয়, এই সিনেমাতে ভারতীয় ছবির একটা প্রভাব লক্ষণীয়। সেটি হলো, যিনি নেতিবাচক চরিত্র তাকে এতটাই নেতিবাচক দেখানো যে, মাঝে মাঝে মাত্রাতিরিক্তও মনে হয়। এটি নিশ্চয়ই অভিজ্ঞ তৌকির আহমেদের কাছ থেকে আশা করিনি।
তবুও কেন আমি শিরোনাম দিলাম এমন ছবি আরও দরকার। তার একটা কারণ আছে। ছবিতে তৌকির আমাদের নাটকের ভাঁড়ামির মতো হাসির দমক ওঠার প্রচুর উপাদান রেখেছেন। যা মাঝে মাঝে খেলো মনে হলেও সিনেমা হল জুড়ে যখন হাসির বন্যা বয়ে যেত তখন খুব ভালো লাগে। এমনিতেই তথাকথিত বেশিরভাগ মেইনস্ট্রিম সিনেমা দেখে বিরক্ত দর্শক। ওগুলো বাদ দিয়ে এই ঘরানার সিনেমা দেখতে এলে মন খারাপ হয়ে যায়। এতই মেসেজের ভার যে, দর্শক আর নিতে পারে না। অর্ধেক ছবি দেখার পর উঠে চলে যায়। নিরানন্দ এক বক্তৃতামূলক ছবি দেখে তারা। কিন্তু এই ছবিটি অন্তত তেমনটি হয়নি। সিনেমা হলজুড়ে দর্শকের হই হুল্লোড় এক প্রাণ এনে দিয়েছিল যা এই সময়ে দরকার অন্তত আমাদের সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি বাঁচাতে।