এ আর রহমান
সংগীত পরিচালক, ভারত
রোজা, কাধালান, বোম্বে, রঙ্গিলা, দিল সে, তাল, লগান, স্বদেশ, রং দে বাসন্তি, গুরু, রকস্টার, স্লামডগ মিলিনিয়র
মাদ্রাজের মোজার্ট তিনি। এ আর রহমান। ভারতীয় উপমহাদেশকে সংগীত দিয়ে চিনিয়েছেন সারাবিশ্ব। ভারতীয় এই সংগীত পরিচালক একাধারে সংগীত পরিচালক, প্রযোজক, সংগীতজ্ঞ ও সংগীতশিল্পী। ১৯৯০ সালের শুরুর দিকে তাঁর সংগীত জীবনের যাত্রা শুরু। এ পর্যন্ত অসংখ্য বার জিতেছেন ফিল্ম ফেয়ার পুরস্কার, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, বাফটা অ্যাওয়ার্ড, গোল্ডেন গ্লোব অ্যাওয়ার্ড এবং অস্কার পুরস্কার। দুইবার গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ডে মনোনীত হয়েছেন।

ভারতীয় চলচ্চিত্র শিল্পে তাঁর অবাধ পদচারণা। চলছে সিনেমা ও মঞ্চনাটকে সংগীতযোজনা। এ পর্যন্ত ১০০ মিলিয়নেরও বেশি গান করেছেন চলচ্চিত্রে, ২০০ মিলিয়নেরও অধিক ক্যাসেট বিক্রি হয়েছে। জায়গা করে নিয়েছেন বিশ্বের সেরা বিক্রি হওয়া গানের শিল্পীর মর্যাদায়।

টাইম সাময়িকী তাকে মোজার্ট অব মাদ্রাজ উপাধি দেন। ২০০৯ সালে টাইম সাময়িকী তাঁকে বিশ্বের সেরা প্রভাবশালী ১০০ মানুষের তালিকায় যুক্ত করে।

শৈশব

এ আর রহমানের জন্ম তামিলনাড়ুর চেন্নাইয়ের একটি ধনী পরিবারে। তার বাবা আর কে শেখর চেন্নাইয়ের একজন সংগীত পরিচালক। কাজ করতেন মালায়লাম চলচ্চিত্রে। রহমান অল্প বয়সেই তাঁর বাবাকে হারান। পারিবারিক খরচ চালাতে বিক্রি করে দেন বাবার কেনা বাদ্যযন্ত্রগুলো। তিনি বড় হন মা কারিমার কাছে। কারিমার পূর্ব নাম কস্তুরি।

একটু বড় হয়ে রহমান একটি ব্যান্ড গড়ে তোলেন। যেখানে তিনি কি বোর্ড বাজাতেন। ওই ব্যান্ডের সদস্য এই সময়ের নামকরা সব সংগীতশিল্পী শিবামানি, জন অ্যান্থনি, সুরেশ পিটার, জোজো ও রাজা। এ ছাড়া রহমান চেন্নাইয়ের রক ব্যান্ড নেমেসিস অ্যাভেনিউ এর প্রতিষ্ঠাতা।

রহমান কিবোর্ড, পিয়ানো, সিন্থিসাইজার, হারমোনিয়াম ও গিটার বাজাতেন। তিনি সিন্থিসাইজার খুব পছন্দ করতেন। কারণ তার কাছে মনে হতো, এটা সংগীত ও প্রযুক্তি সঠিক মিশ্রণ।

গুরু ধনরাজের কাছে সংগীত শিক্ষা শুরু করেন এ আর রহমান। ১১১ বছর বয়সে তিনি কিবোর্ড বাজিয়ে হিসেবে কাজ শুরু করেন ইলাইয়ারাজা দলে। এই দলে অনেক সংগীত পরিচালক ছিলেন যারা রহমানের বাবার কাছ থেকে বাদ যন্ত্র ভাড়ায় নিয়ে বাজাতেন।

এরপর রহমান বাজাতে শুরু করেন এম. এস. বিশ্বনাথান রমেশ নাইড়ু এবং রাজ কোটি এর অর্কেস্ট্রাতে। যেখানে ছিলেন জাকির হোসাইন, কুন্নাকুড়ি বিদ্যানাথান, এল. শঙ্করের মতো সংগীতশিল্পী কাজ করতেন। এদের সঙ্গে তিনি বিভিন্ন জায়গায় ট্যুরও করেন। একসময় ট্রিনিটি কলেজ অব মিউজিকে বৃত্তি পান। সেখান থেকে পশ্চিমা সংগীতের ওপর স্নাতক ডিগ্রি নেন।

সংগীত জীবন
১৯৯২ সালে এ আর রহমান তাঁর নিজের মিউজিক রেকর্ডিং ও মিক্সিং স্টুডিও শুরু করেন। যেটি ধীরে ধীরে ভারতের সবচেয়ে নামকরা ও আধুনকি স্টুডিও হিসেবে নাম করে। নাম পঞ্চাতান রেকর্ড ইন।

তিনি প্রথম দিকে বিজ্ঞাপনের জন্য জিঙ্গেল, ভারতীয় টেলিভিশনের জন্য সংগীত ও প্রামাণ্যচিত্রের জন্য সংগীত পরিচালনা করতেন। ১৯৯২ সালে তিনি দক্ষিণের নাম করা পরিচালক মণি রত্নমের কাছে রোজা সিনেমার সংগীত পরিচালনা করার প্রস্তাব পান।

রোজা তাকে বঅরত জুড়ে খ্যাতি এনে দেয়। তার সংগীত প্রতিভা ভারতীয় চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক সংগীতে আলাদা পরিচয় এনে দেয়। এরপর একের পর এক ভারতীয় সিনেমায় সংগীত পরিচালনা করতে থাকেন রহমান। মণি রত্নমের বোম্বে, দ্য আরবানিত কাধালান, ভারতী রাজার কারুত্থামা, দ্য স্যাক্সোফোনিক ডুয়েট, ইন্দিরা, এবং মি. রোমিও ও রাভ বা্র্ড। সিনেমাগুলো এ আর রহমানকে নিজের জাত চেনাতে সাহায্য করে।

অনেক জনপ্রিয় সিনেমার মধ্যে উল্লেখযোগ্য সিনেমা হলো, দিল সে ও তাল। সুফি ঘরানার গানের স্টাইল তাঁকে অন্য এক জায়গা তৈরি করে দেয়। বিশেষ করে নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বোস: দ্য ফরগোটেন হিরো সিনেমাতে জিকর গানে তিনি ব্যবহার করেন বিশাল অর্কেস্ট্রা ও কোরাল আয়োজন। যা চলচ্চিত্রের প্লেব্যাক সংগীতে আলাদা মাত্রা যোগ করে।

২০০৬ সালে এ আর রহমান তার নিজস্ব মিউজিক লেভেল নিয়ে আসেন কে এম মিউজিক নামে। এখান থেকে তিনি তাঁর প্রথম বের করেন সিল্লুনু ওরু কাধাল সিনেমার সংগীত। ২০০৮ সালে তিনি স্লামডগ মিলিনিয়র সিনেমার সংগীত করেন। যা তাকে গোল্ডেন গ্লোব ও দুটি অস্কার পুরস্কার এনে দেয়। এর মাধ্যমে প্রথম ভারতীয় হিসেবে তিনি অস্কার পুরস্কার জেতেন। গানটি বিলবোর্ড টপ ২০০ চার্টে চার নম্বরে ছিল। সিনেমার গান জয় হো ইউরোচার্ট হট ১০০ এর দুই নম্বরে ছিল। বিলবোর্ড হট ১০০ চার্টে ১৫ নম্বরে ছিল।

ব্যক্তিগত জীবন
তিনি সায়রা বানুকে বিয়ে করেন। তাঁর তিন সন্তান। খাদিজা, রাহিমা ও আমিন। শৈশবে সংসারের টানাপোড়েন এ আর রহমান নাস্তিকতার দিকে ঝুঁকে যান। পরবর্তীকালে তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন ১৯৮৯ সালে। তিনি তাঁর মাকে খুব ভালোবাসেন। অস্কার পুরস্কার পাওয়ার সময় তিনি বলেছিলেন, আমার কাছে মা আছে।

সামাজিক কাজ

এ আর রহমান নানা সামাজিক কাজের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করেছেন। তিনি ২০০৪ সালে ওয়ার্ল্ড হেলথ অরগানাইজেশন এর বিশ্ব দূত হিসেবে মনোনীত হন। তিনি সেভ দ্য চিলড্রেন ইন্ডিয়ার সঙ্গে কাজ করেন। তিনি গান দিয়ে বিভিন্ন জায়গায় সাহায্য করেন। এ ছাড়া নানা ধরনের বেসরকারি সাহায্য ও সমাজকল্যাণমূলক সংস্থা ও সংগঠন তিনি গড়ে তুলেছেন।