নাম: অ্যাং লি
জন্মস্থান: পিং তুং, তাইওয়ান
জন্ম: ২৩ অক্টোবর ১৯৫৪
পেশা: পরিচালক ও প্রযোজ
অভিনেতা হতে চেয়েছিলেন অ্যাং লি। কিন্তু চাইনিজ একসেন্ট তাকে খুব একটা সুবিধা করতে দেয়নি হলিউডে। অগত্যা সিনেমা বানানোতেই পড়া লেখা করলেন। আর পরিচালক হিসেবে জনপ্রিয়তা পেলেন বিশ্বজোড়া। দ্বিতীয় বারের মতো লাইফ অব পাই দিয়ে অস্কার ঘরে তুললেন। প্রথম অস্কার আসে ব্রকব্যাক মাউন্টেইন সিনেমা দিয়ে।

অ্যাংলি বিশ্বাস করেন জীবন পুরোটাই একটা শিক্ষাযাত্রা। সবসময়ই তিনি একজন চলচ্চিত্রের শিক্ষার্থী। এ কারণে তিনি বলে থাকেন, ‘আমি সবসময়ই ভিন্ন ভিন্ন স্বাদের সিনেমা বানাই। নানা জায়গায় যাই ভিন্ন রকমের অভিজ্ঞতার গল্প সঞ্চয়ের জন্য। আমি আমার জীবন থেকেই শিখতে চাই। এবং সিনেমা বানানোর মধ্য দিয়ে নিজেকে আবিষ্কার করি। আমার কাজগুলো সবসময়ই আমার ভাবনা দিয়ে পরিচালিত হয়। আমি আমার অনুভূতি অনুসরণ করি এবং এর সঙ্গে আমার দর্শকদের পরিচয় করাই।‘

এই হলো তাইওয়ানের চলচ্চিত্রকার অ্যাং লির চলচ্চিত্র চিন্তা। লাইফ অব পাই সিনেমায় সেরা পরিচালক হিসেবে অস্কার জেতার পর এই সাক্ষাতকার নেওয়া হয়। সাক্ষাতকারটি নেন ইউনিভার্সিটি অব পেনিসেলভেনিয়ার ওয়ার্টন‘স জোসেফ এইচ. লাউডার ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ-এর শিক্ষার্থীরা। তাঁর চুম্বকাংশ তুলে ধরা হলো। এটি প্রকাশ করা হয় বিশ্ববিদ্যালয়টির সাইটেই।

আপনি বিচিত্র সব চলচ্চিত্রে নিয়ে কাজ করেন। ব্রকব্যাক মাউন্টেন, ক্রাউচিং টাইগার হিডেন ড্রাগন, ওয়েডিং ব্যাংকুয়েট ও লাইফ অব পাই-সবগুলো সিনেমাই পরস্পর আলাদা। আপনি ছবির বিষয়বস্তু কীভাবে ঠিক করেন?
এটা আমার কাছে ঘোরাঘুরির মতো। আপনি প্রত্যেকবারই নতুন জায়গায় ঘুরতে যেতে চাইবেন। আমরা সব সময়ই জীবন থেকে শিখি। বিদ্যালয়টা শুধু শুরু করিয়ে দেয়। সব কাজই শেখার একটি প্রক্রিয়া। আমি সবসময়ই ভিন্ন ভিন্ন স্বাদের সিনেমা বানাই। নানা জায়গায় যাই ভিন্ন রকমের অভিজ্ঞতার গল্প সঞ্চয়ের জন্য। আমি আমার জীবন থেকেই শিখতে চাই। এবং সিনেমা বানানোর মধ্য দিয়ে নিজেকে আবিষ্কার করি। আমার কাজগুলো সবসময়ই আমার ভাবনা দিয়ে পরিচালিত হয়। আমি আমার অনুভূতি অনুসরণ করি এবং এর সঙ্গে আমার দর্শকদের পরিচয় করাই। আমার কাছে চলচ্চিত্র বানানো কাজ নয়, এটাই আমার জীবন।

আমি প্রচুর পরিমাণে সিনেমার পেশাদারি কায়দা শিখেছি। আমার চার নাম্বার কাজ (সেন্স অ্যান্ড সেন্সিবিলিটি) করার পর আমি এই ক্লিশে ফিল্ম বানানোর পদ্ধতি ছুড়ে ফেলে দিই। আমি চেষ্টা করি নানা ধরনের চলচ্চিত্র বানাতে। যদিও এতে আমি বেতন কম পাই। তবে আমি যখন এরকম নানা ধরনের চলচ্চিত্র বানাতে শুরু করি। মানুষ বুঝতে পারে আমি একই ধরনের ক্লিশে সিনেমা বানাই না। পুরো পৃথিবী অনেক বড়। এখানে হাজারটা বিষয় আছে। কেন আমি একই বিষয় বারবার করব? অবশ্যই অনেক মানুষ আছে যারা এই বিষয়ে আরও ভালো করবে। কিন্তু আমি প্রতিনিয়ত পরীক্ষা নীরিক্ষা করতে ও রোমাঞ্চকর বিষয় ভালোবাসি। এভাবেই আমি শিখি এবং প্রতিদিন বেড়ে উঠি।

চীনের মধ্যে থেকেই তাইওয়ান কীভাবে নিজেকে তুলে ধরছে? অনেকেই বলছে তাইওয়ানের বিচিত্র সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যই তাকে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে দিচ্ছে। আপনি কি একমত? কীভাবে তাইওয়ান এটি করছে?
আপনার প্রশ্নটি আমি তখনই বুঝতে পেরেছি যখনই আপনি বলেছেন তাইওয়ানের নিজেকে তুলে ধরা অপ্রতুল। তাইওয়ানের তথা কথিত কিছু শক্তি আছে। আমরা চীনের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি দিয়ে লালিত পালিত। তার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছি পশ্চিমা সংস্কৃতিকে। তার সঙ্গে বাড়তি হিসেবে আছে জাপানি সংস্কৃতি। তার সঙ্গে যুক্ত করতে পারি এটি যে, তাইয়ানের মানুষেরা খুবই ভালো মানুষ। এও হতে পারে যে আমি তাইওয়ানিজ তাই বলছি।

মূলত মানুষ হিসেবে তাওয়ানিজরা খুবই ভালো। এটা তাদের একটা বাড়তি সুবিধা। কিন্তু বিশ্ব তাইওয়ানকে খুব বেশি বুঝতে চায় না। তাই আমি লাইফ অব পাইকে তাইওয়ানে শুটিং করেছি তাইওয়ানকে বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরতে।

যদি তাইওয়ানের চলচ্চিত্র নিয়ে আলাদা করে বলি। তবে বলতে হয়, তাইওয়ানে এখনো চলচ্চিত্র শিল্পের কোনো কাঠামো গড়ে ওঠেনি। একটা ইন্ডাস্ট্রির মৌলিক উপাদান সবকিছুই এখানে আছে। শুধু প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সাজানো নেই। আমাদের চলচ্চিত্র শিল্পটি আরও শক্তিশালী হওয়া দরকার। সরকারের উচিত এদিকে আরও মনযোগ দেওয়া।

তাইওয়ানিজ জনগণের যেকোনো বিষয়ের প্রতি তৃষ্ণা থাকতে হবে। তরুণদের বেশি সজাগ থাকতে হবে। আমরা মারাত্মক চেষ্টা করে যাচ্ছি। কারণ বর্তমানে পাওয়া সুযোগগুলো বেশি দিন টিকবে না। আমি মনে করি চীনের জনগণ আরও বেশি পরিশ্রমী।

আপনি আন্তর্জাতিক কাজ দিয়ে আন্ত সাংস্কৃতিক সেতু তৈরি করেছেন। আপনার মূল লক্ষ্য কী?
ব্যাপারটি এমন না। এটা শুরুতে আমার টিকে থাকার জন্য করতে হয়েছে। আমার আসলে স্বপ্ন ছিল অভিনেতা হওয়া। কিন্তু আমি ফেল করি। কারণ আমার ইংরেজি ছিল মারাত্মক রকমের দুর্বল। তখন আমার বয়স ২৩, কেবল আমেরিকাতে নাটক নিয়ে পড়ছি। সত্যি বলতে আমি এখনো মঞ্চ নিয়ে ঘোরের মধ্যে থাকি। যদিও আমি আমার গল্পগুলো ক্যামেরা দিয়েই বলছি। আমি প্রাচ্য ও প্রতিচ্য দুই সাংস্কৃতিক আবহতেই বেড়ে উঠেছি। আমি নিউ ইয়র্কে থাকি। আমার সঙ্গে যারা চলচ্চিত্রে কাজ করে তার প্রায় সবাই-ই আমেরিকান।

নিউ ইয়র্কে আমার প্রথম চলচ্চিত্র কিন্তু একটি তাইওয়ান ফিল্ম কোম্পানিই প্রযোজনা করে। এটা তাইওয়ানের জনপ্রিয় ঘরানার দর্শকদের বেশ ভালো লাগে। আমার দ্বিতীয় চলচ্চিত্র ওয়েডিং ব্যাংকুয়েট আমাকে আন্তার্জাতিক পরিচিতি এনে দেয়। প্রথম দিকের চলচ্চিত্রগুলো ছিল এশিয়ার মেইনস্ট্রিম সিনেমা। কিন্তু আমেরিকাতে এই সিনেমাগুলো খুব ধীর লয়ে পরিবেশিত হতো। কারণ এগুলো ধরা হতো বিদেশি ভাষার সিনেমা হিসেবে। কিছু চীনা সিনেমা করার পর আমি ইংরেজি সিনেমা করা শুরু করি। আমি ক্রাইচিং টাইগার হিডেন ড্রাগন সিনেমার প্রচারের জন্য বিশ্বজুড়ে দৌড়ে বেড়াই। এটা আন্তর্জাতিকভাবে একটা সফল সিনেমা হয়ে যায়।

একজন চলচ্চিত্রকার হিসেবে আমাকে মনে হয় ভাসমান জাহাজের মতো। যা আমি অনুভব করি, তাই প্রকাশ করি। এটা আসলে নীরিক্ষা। আমরা আসলে পরিকল্পনার থেকে আমাদের অনুভূতিগুলো দিয়ে চালিত হই। তোমার আছে আবেগ, এবং তুমি এটি প্রকাশ কর। আমাদের কেউ না কেউ সবসময়ই খেয়াল করে। অনেক শিল্পীই কনসেপ্ট দিয়ে শুরু করে না। আমরা অনেক বেশি নিজেদের ভেতরের অনুভূতি দিয়ে তাড়িত। তাই আমার কাজগুলো আবেগ দিয়ে পরিচালিত হয়। আমি আমার আবেগকে অনুসরণ করি। এবং তাদের দর্শকের কাছে পৌঁছাই।

আপনার পরিবার ছাড়াই আপনি বাইরে থাকছেন। যাদের একটা বড় প্রভাব আপনার জীবন ও কাজের ওপর আছে…
আমার উপর পরিবারের বড় প্রভাব আছে। যেমন পিতা পুত্রের সম্পর্ক। আমার কাজের মধ্যে এই সম্পর্ক একটি মৌলিক থিম হিসেবে থাকে। আমার পরিবারের বাইওে জেমস শ্যামুস আমার জীবনে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। সে আমার কর্মজীবনের দীর্ঘ দিনের সহচর। ও কাজের সময় আমার দিকে খেয়াল রাখে। একদম শুয়ো পোকা থেকে শুরু করে কাজটি প্রজাপতির মতো ডানা মেলা পর্যন্ত কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকে। সে আমার জন্য অনেক পা-ুলিপি লিখেছে। সিনেমা বিক্রিতেও সাহায্য করেছে। সে এখন ফোকাস ফিচার্স নামের একটি প্রযোজনা ও পরিবেশনা সংস্থার প্রধান নির্বাহী। সুতরাং সেই আমার তিনটি কাজের মালিক। সে আমাকে অবশ্য কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়েছেও।

অনেকের সঙ্গেই কাজ করতে করতে সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। যখন তুমি একটি বিষয় নিয়েইে নিবিষ্টভাবে জীবন যাপন করবে, সেটিই হয়ে উঠবে তোমার গল্প। লাইফ অব পাই করার আগে আমি বিগত চার বছর পাই এর মতো পানিতেই মনযোগী ছিলাম। এই একাকিত্বকে অনুভব করার জন্য আমি জেমসের সঙ্গেও কাজ করা বন্ধ করে দিলাম। এই প্রথম আমি জেমস ছাড়া কাজ করলাম। আমি একাকিত্বের অনুভূতি নিতে চাচ্ছিলাম। সে কারণেই শেষমেষ আমরা কাজটি সফলতার সঙ্গে করতে পেরেছি। আমরা প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূলের অনুভূতিকে ধরতে পেরেছি। আমার জীবন সিনেমার সঙ্গে সঙ্গেই পরিণত হয়।

আপনি অনেকগুলো আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছেন। সামনে আপনার পরিকল্পনা কী?
আমি যা বললাম আরকি। আসলে আমার কোনো পরিকল্পনা নাই। যখন আমি তরুণ ছিলাম আমার জন্য কেউ পা-ুলিপি লেখেনি। আমি নিজেই পা-ুলিপি লিখেছি। এখন প্রচুর মানুষ যারা আমার জন্য লেখে। আমি শুধু দেখি কোনটি আমার কল্পনাকে উদ্দীপ্ত করেছে। অনেক পরিচালকই একই সময়ে অনেকগুলো সিনেমা পরিচালনা করেন। আমি পারি না। আমি সবসময়ই এক বছর একটি সিনেমার জন্য ব্যয় করেছি। যতক্ষণ না এটি শেষ করার পর্যায়ে যায় আমি অন্য সিনেমায় হাত দেই না। আমার জীবনে অন্য কোনো শখ নেই। আমি শুধু সিনেমা বানাতে ভালোবাসি।

এখন অবশ্য আমার সিনেমা নানা মাত্রিক হয়ে পড়ছে। লাইফ অব পাই সিনেমাতে অনেক উচ্চতর প্রযুক্তি ব্যবাহর করা হয়েছে। আধুনিক ভিজ্যুয়াল আর্ট যুক্ত আছে এই সিনেমায়। এটা আমার কাছে উপন্যাসের মতো, যদিও খুবই ব্যয়বহুল কাজ। ভবিষ্যতে আমি কম বাজেটের সিনেমার দিকে ফিরে যাব।

এখন আমি একটি নতুন প্রকল্প নিয়ে কাজ করছি। সেটা হলো একটি টেলিভিশন নাটক। নাটক এর আগে আমি কখনোই বানাইনি। এটা শুটিং করা হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যে। খুবই মজার নাটক বানানো।

আমার আগের নয়টি চলচ্চিত্র ছিল বই অবলম্বনে। এখনো আমি প্রচুর ইংরেজি ও চায়নিজ পা-ুলিপি পড়ছি। সুতরাং আপনার উত্তর আমি এখনই দিতে পারছি না।

আমি আপনার সাক্ষাতকারে পড়েছি ২০০৮ সালে ব্রকব্যাক মাউন্টেইন সিনেমা দিয়ে আপনি অস্কার পেলেন। আপনি বলেছেন, সেখানে আপনি প্রচুর বাধা ও চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছেন। আপনি সিনেমার শিক্ষার্থীদের কী ধরনের পরামর্শ দেবেন?
জীবন সব সময়ের জন্য শেখার একটি প্রক্রিয়া। জীবনে যতদিন বাঁচ, শিখতে থাক। কখনোই ভেব না যে তুমি উত্তর জান। সবসময়ই চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হও। জীবন তোমাকে অনেক কিছু শেখাবে, বিদ্যালয় কেবল শিক্ষার দরজা মাত্র।

যারা সিনেমা বানাতে চাও তাদের বলব, নিজে পা-ুলিপি লেখার চেষ্টা কর। যখন তুমি তরুণ কেউ তোমাকে স্ক্রিপ্ট লিখে দেবে না। একজন চীনা অভিনেতার জন্য আমেরিকাতে একটি চরিত্র বাগিয়ে নেওয়া খুবই কঠিন। সুতরাং তোমাকে লেখা শিখতে হবে এবং বানাতে শিখতে হবে। বিষয় হতে পারে কোনো উপন্যাস থেকে যা তোমার বাস্তব জীবনের সঙ্গে মিলে যায়। কিন্তু ওই বিষয়টির সঙ্গে অবশ্যই তোমার ব্যক্তিগত আবেগ জড়িত থাকতে হবে। এবং বিষয়টির বিশ্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা থাকতে হবে। তাহলেই এটি বিশ্বজুড়ে গৃহীত হবে।

আপনার কোন সিনেমাগুলো বেশি প্রভাব ফেলছে? এবং কেন?
আসলে প্রত্যেকটা সিনেমাই আমার জন্য এক ধরনের অভিজ্ঞতা ছিল। প্রত্যেকটা সিনেমাতে সেটাই উঠে এসেছ যা ওই সময়ে আমি চেয়েছিলাম। যদি আমাকে পছন্দ করতে বলেন তবে বলব, লাস্ট কশন এর নাম। কারণ হলো, নারীর যৌনতা, যুদ্ধে জাতীয়তাবাদ ও বিশ্বাসঘাতকতা একসঙ্গে একটি গল্পে বলা একজন চায়নিজের জন্য ভয়াবহ। এর থেকে একজন আমেরিকান গে কাউবয়কে চরিত্রায়ন করা সহজ (ব্রকব্যাক মাউন্টেইন)।

সিনেমার একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো মানবীয় প্রকৃতিগুলোকে প্রসারিত করা। যদি সবাই ভালো ও সুন্দর হয়ে যায় তাহলে পরীক্ষা নীরিক্ষার কিছু থাকে না। লাস্ট কশন সিনেমাতে আমি শুধু থিমটাকেই বলা প্রয়োজন মনে করিনি। এভাবে অনাকাঙ্খিতভাবে বিষয়টির মুখোমুখি হতেও আমি ভয়ে ছিলাম। কিন্তু আমি চায়নিজ সংস্কৃতিতে এমন একটি নিষিদ্ধ বিষয়কে তুলে আনাকে প্রয়োজন মনে করেছিলাম। এই সিনেমাটি খুবই কষ্ট দেয়, বেদনা এবং অনাকঙ্খিত অভিজ্ঞতা দিয়ে ভরা। আমেরিকানরা এই ধরনের গল্পে আগ্রহী না। কারণ এই বিষয় নিয়ে তাদের অত কোনো আবেগ নাই।

আপনি হোমোসেক্সুয়াল বিষয় নিয়ে সিনেমা বানিয়েছেন। আমি মনে করি আপনার উদ্দেশ্য ছিল পশ্চিমা দর্শক। কীভাবে একই বিষয়ে আপনি এশিয়ার জন্য সিনেমা নির্মাণ করবেন, বিশেষ করে চীনের জন্য?
এটা একটা বিষয়। ওয়েডিং ব্যাংকুয়েট তাইওয়ানের মেইনস্ট্রিম দর্শকের জন্য তৈরি করেছিলাম। আমি আশা করিনি যে এটি আমেরিকার বক্স অফিসেও ভালো আয় করবে। পা-ুলিপিটা তাইওয়ান সেন্ট্রাল মোশন পিকচার করপোরেশনের জন্য লিখেছিলাম। কিন্তু তারা নিতে চায়নি হোমোসেক্সুয়াল থিমের জন্য। আমেরিকানরা এটা নিতে চায়নি কারণ এটা চায়নাদের নিয়ে লেখা। সুতরাং আমি পরে বানানোর একটা সুযোগ পেয়ে গেলাম। সিনেমাটা তাইওয়ান ও বিশ্বজুড়ে বেশ সুনাম কুড়িয়ে নিল। ব্রকব্যাক মাউন্টেইনও অবশ্য তাইওয়ানেও ভালোভাবে গ্রহণ করেছে। অনেকে ছবিটি এক ডজনেরও বেশিবার দেখেছে।

আমি সিনেমা নিয়ে জাতীয়তাবাদে একদম স্পর্শকাতর নই। আমি তাইওয়ানে চীনা সংস্কৃতিতে বেড়ে উঠেছি। তাই আমার দৃষ্টিভঙ্গী আরও বেশি প্রাচ্য কেন্দ্রীক। একই সময়ে আমি ধারণ করেছি প্রচুর পশ্চিমা সংস্কৃতি ও প্রযুক্তি। আমি আমার আমেরিকান সহকর্মীদের সঙ্গে সবসময়ই কাজ করি।

লাইফ অব পাই কে উদাহরণ হিসেবে নেওয়া যায়। এটা ইংরেজি ভাষার সিনেমা। এটার গল্প আবার ভারতীয়। যদিও এটা তাইওয়ান ও চীনের জন্য সবচেয়ে বেশি ভালো। সুতরাং এটা আমার কাছে কোনো পার্থক্য সৃষ্টি করে না। আমি মনে করি, আপনি এমন কিছু খুঁজতে পারেন যা পৃথিবীর যেকোনো কোনার মানুষের সঙ্গে মিলে যাবে। মানুষ সংস্কৃতির মাধ্যমে বিভক্ত না। সাংস্কৃতিক বিভক্তিকে উপেক্ষা কওে তোমার হৃদয় শিল্পকেই বেশি গুরুত্বসহকারে গ্রহণ করবে। এটা মানবীয় প্রকৃতি।

একজন সিনেমাওয়ালা হিসেবে আমি একটি নির্দিষ্ট জায়গাকে বুঝতে পেরেছি। কিন্তু আমি মানুষের মানবীয় প্রকৃতিকে তুলে ধরতে চাই সংস্কৃতির মেলবন্ধনের মাধ্যমে, যা সর্বজনীন।

আমি লাইফ অব পাই সিনেমাটিকে পছন্দ করি এবং উপন্যাসটি পড়েছি। অনেক বিষয়ের এখানে ইন্টারপ্রেটেশন আছে। সিনেমাতে কোনটাকে মূল থিম ধরেছেন আপনি?
যখন আমি প্রথম উপন্যাসটি পড়ি আমি ধর্মের কথা ভাবিনি। আমি ভেবেছি লেখকের লেখকীয় চিন্তার কথা। এটা গল্প এবং লেখকের একটা যোগাযোগমাত্র। আমি মনে করি, লাইফ অব পাই ধর্ম নিয়ে নয়, ঈশ্বও নিয়ে কথা বলে। ঈশ্বর কী? এর সংজ্ঞা দেওয়া মুশকিল। আমরা চীনারা মনে করি, মাথার তিন ফুট উপরের কিছুই হলো ঈশ্বর। যা তোমার কাছে অপরিচিত এবং যাকে তুমি নিয়ন্ত্রণ করতে পারছ না তা-ই ঈশ্বর। আমার কাছে মনে হয়, ঈশ্বর হলো তোমার অপরিচিত কোনো কিছুর প্রতি আবেগমাখা যোগাযোগ।

প্রাচ্যের লোকেরা মিথলোজির ওপর ভরসা করে ইবাদত করে। আমি শ্রদ্ধা করি তাদের কিন্তু আমি এসব বুঝি না। এই বই আমাকে ওই অপরিচিত জিনিসের দিকে মনযোগ দিতে আগ্রহী করেছে। আমাদের শুধু জানাই প্রয়োজন নয়, আমাদের এটাও জানা দরকার যে, আমরা জানতে পারি না। বিশ্বাস হলো আমাদের আবেগি জীবনে অপরিচিত কিছু বিষয়ের সঙ্গে যোগাযোগ মাত্র।

এটা সিনেমার গল্প বলায় অন্তর্ভূক্ত হয়েছে। কেন আমি এই গল্পটি বলতে চাই? কারণ জীবনের কোনো মানে নেই। আমরা কৃত্রিমভাবে এর মানে বের করতে পারি না। আমরা বুদ্ধিবৃত্তিক ইন্টারপ্রেটেশন তৈরি করতে পারি আমাদের নিজস্ব ভাবনা ও বোঝাপড়ার ওপর। তাই আমি এই গল্পটি বলার তাগিদ অনুভব করেছি। একটা গল্প একটা কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়। একটা শুরু থাকে, মধ্য থাকে এবং শেষ থাকে। সুতরাং এই গল্প একদমই অর্থহীন। আমার কাছে মনে হয়, এই গল্প বলার একটা অর্থ হলো জীবনের মাঝে খুঁজে বের করাও। পাই হলো অসীম ও অমূলদ সংখ্যা। এটা সবসময়ই সংখ্যা বাড়াতে থাকে। সুতরাং এটা আসলে জীবনের অভেদ্য, অর্থহীন, অযৌক্তিক প্রকৃতিকে তুলে ধরে। এই গল্পটি দিয়ে জীবনের একটা মানে বলার চেষ্টা করেছি।

আমি মনে করি জীবনের মানে আছে। কিন্তু বৌদ্ধধর্ম অনুযায়ী এটি মায়া ছাড়া আর কিছুই নয়। আপনি কি মনে করেন যা আপনি ছুঁতে পারেন তার থেকে মায়ার অর্থ কোনো অংশে কম?

একজন আন্তর্জাতিক পরিচালক ও প্রযোজক। সঙ্গে সঙ্গে আপনি একটি সংস্থার ব্যবস্থাপকও। কীভাবে বাজেট, ব্যয়, প্রচার, আয় ইত্যাদি বিষয়গুলোর ব্যবস্থাপনা করেন?
চীনা একটি প্রবাদ আছে, ঈশ্বরের চেয়ে মানুষ ভালো গুণন করতে পারে না।

সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিতে প্রচুর এমবিএ এবং আইনের স্নাতকরা কাজ করে। আমরা যদি সবাই বুঝতে পারতাম কীভাবে সিনেমা দিয়ে টাকা আয় করা যাবে, তাহলে সবাই ধনী হয়ে যেতাম। বাস্তবতা হলো বেশিরভাগ সিনেমাই লস দিতে হয়, কিছু সিনেমা হিট করে। ব্যবসায়ীক দিক থেকে কেউই বলতে পারে না ফলাফল কী হবে।

তোমাকে শুধু ব্যবস্থাপনা করা শিখতে হবে। বাজেট নিয়ন্ত্রণ করা শিখতে হবে। তোমার একটি স্বপ্ন থাকতে হবে, তা বাস্তবায়ন করতে হবে। যেকোনো জিনিস বাস্তবায়ন করতে তোমাকে অনেক বেশি যৌক্তিক ও গোছানো হতে হবে। আমি মনে করি এটাই আমার শক্তি। আমি একজন পরিচালকই নই একজন প্রযোজকও। সুতরাং আমি কাজের বেলায় খুবই গোছানো এবং দক্ষ। আমি সিনেমা হিট করল কি করল না, এটা নিয়ে ভাবি না।

সংগীত কিছুটা গণিতের মতো। সিনেমাও তাই। এটা শুধুই কোনো প্রতিভা নয়। এটা একটি বড় প্রকল্প, ব্যবস্থাপনাও এটার একটা বড় কাজ। কিন্তু দিনশেষে দর্শককে এটা বোঝাতে হবে যে, সবকিছু মিলে একটা জিনিস। যেটা আবার ক্যালকুলেশন করে বোঝানো যাবে না। এটা বোঝাতে হবে কেবল অনুভূতি দিয়েই।

আমি মনে করি খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কী তুমি ব্যবস্থাপনা করলে না? যেমন আবেগ। কারণ একটা সিনেমাকে কিন্তু আবেগি সফর। যদিও সিনেমা বানানো একটি ব্যবস্থাপনার বিষয় বটে। গল্পকে টেনে নিতে তোমার আবেগ লাগবেই। এটা এমন কিছু যা তোমার ব্যবস্থাপনা দিয়ে হবে না। যা তোমার হৃদয় দিয়ে উপলদ্ধি করতে হবে। শিল্প খুবই বিমূর্ত জিনিস।