জন্ম: ১৫ আগস্ট ১৯৬৩
জন্মস্থান: মেক্সিকো সিটি, মেক্সিকো
পেশা: চলচ্চিত্র পরিচালক

 

মি. ইনারিতু, একজন চলচ্চিত্র পরিচালককে কি তাঁর সিনেমাতে দেখা যায়?
আমি মনে করি প্রত্যেকটি চলচ্চিত্র আপনার জীবনের একটি বাড়তি অধ্যায়। তা যা-ই হোক না কেন। আমার প্রত্যেকটি সিনেমা আমার নিজের জীবনের বাড়তি একটি অংশ। মাঝে মাঝে আমার মনে হয় চলচ্চিত্রগুলো বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে শুরু হয়। হঠাৎ চোখের সামনে একটা ঝাপসা কিছু দেখি। কিছুক্ষণ পর যা আবার অদৃশ্য হয়ে যায়। সিনেমাতে কাঠামোবদ্ধ হয়ে যা চলছে সেগুলোই দেখবেন আপনার জীবনের চারপাশে খুবই বাস্তবভাবে চলতে শুরু করেছে। আমার জীবনে অনেকবারই এমন ঘটেছে।
 
ঠিক কোন সিনেমার ক্ষেত্রে এমনটি মনে হয়েছে?
এই যেমন ধরুন দ্য রেভেন্যান্ট এর বেলায়। এই ছবির থিম আসলেই আমাদের প্রতিদিনের জীবনের অংশ। পানি ছিল মারাত্মক ঠা-া। একদিন তো আমরা মাইনাস ৪০ ডিগ্রির নিচে ছিলাম। সিনেমার চরিত্রের শারীরিক বাস্তবতা আর আমাদের বাস্তব জীবনের শারীরিক বাস্তবতা একাকার হয়ে গিয়েছিল।
ঠিক এই পরিস্থিতিতে কেন শুটিং করতে চাইলেন?
আমি খুবই খুশি যে, একটা বুনো ব্যাপার কিন্তু ঠিকই বের করে আনতে পেরেছি। এবং ঐতিহ্যের কাছে ফিরে যেতে পেরেছি। সিনেমার মূল ঘটনাটা যেখানে ঘটেছে। সেই মূল জায়গাটাতেই আমরা শুটিংটা করেছি। যেখানে আমরা দালান বেষ্টিত একটি কৃত্রিম পৃথিবী খুঁজিনি। অথবা আধুনিকভাবে আবিষ্কারের চেষ্টা করিনি। এটা আমার কাছে পরিষ্কার যে, কম্পিউটার ও সেটা ডিজাইনার যতই ভাল হোক না কেন কখনোই বাস্তব পৃথিবীর সঙ্গে মিলবে না।
কেন নয়?
শুধু এর জটিলতা ও সৌন্দর্য্যরে জন্যই নয়। অধিকন্তু আমার মন বলছিল প্রাকৃতিক পরিবেশই এই চলিচ্চিত্র বানাতে যে উপাদান লাগবে সেটি দিবে। এটা একটা প্রতিবিম্বও পুরো সিস্টেমের তাই না? আমি সত্যিই এই অভিজ্ঞতাকে ভালোবাসি। এই দেখুন না। ‘দ্য ওডেসি’ সিনেমাটা নির্মাণ নিজেই একটি সিনেমা। আমরা নিজেরাই এর শিকার হই তাই না? এটা ছিল দারুণ এবং বিশাল এক মানসিক ও শারীরিক অভিজ্ঞতা।
এটা আমাকে মনে করিয়ে দেয় হার্জগের ‘আগিয়েরে’, ‘দ্য র্যাথ অব গড’ ছবিগুলো। যেখানে তিনি বিশ্বাস করতেন পেরুর কঠিন বর্ষণমুখর বনাঞ্চলে শুটিং করলে তা সিনেমার ভেতরেও প্রভাব ফেলবে।

হ্যাঁ, তাতো ঠিকই। হার্জগের ‘আগিয়েরে’ কিংবা ‘ফিৎজক্যারাডো’ আমাকে প্রভাবিত করেছিল। অথবা আকিরা কুরোসাওয়ার ‘দেরসু উজালা’, এমনকি ‘অ্যাপক্যালিপস নাউ’ ছবিও। এই ছবিগুলোতে মানুষ বনাম প্রকৃতির লড়াই দেখানো হয়। এবং সেখানের ল্যান্ডেস্কেপটা এমনভাবে এসেছে যে চরিত্রের অনুভবের জায়গাগুলোতে ভীষণ রকমের প্রভাব ফেলেছে।

আগিয়েরে’ বানানোর সময় হার্জগ ও কালুস কিনস্কি নিজেদের তো প্রায় শেষ করে দিয়েছিলেন।
হ্যাঁ। যখন আপনি সেখানে শুটিং করবেন দেখবেন যে, এটা দশগুণ কঠিন। এই ছবিটা আসলে একটা সোজা সিদ্ধান্তের ফসল। আমি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম কারণ আমি ছিলাম অন্ধ। কেউ কখনোই ভালো থাকার সুযোগ পরিত্যাগ করবে না। এবং এর জন্য প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করবে। এটাই ছিল ব্যাপার। এটা ছিল পর্বতে চড়ার মতো। একবার তুমি দড়ি ছাড়া পর্বতে চড়ে মাঝখানে চলে গেলে। তুমি জানো যেকোনো ভুলের জন্য তুমি পড়ে যেতে পার এবং নিশ্চিত মৃত্যু হবে। প্রতিদিনের আমরা যে চলচ্চিত্র বানাই তা এমনই।
এতো ভয়ঙ্কর!
আমার পাগলামির এটা তো ছোট উদাহরণ। এটা আরও ভয়ংকর হতে পারে। সবকিছুই খুব সহজে ভুল হয়ে যেতে পারে। প্রতিদিনই প্রচুর পরিমাণে চ্যালেঞ্জের মোকাবেলা করতে হয়। আপনি আপনার নিজের কাজেরই একজন সৃষ্টি হতে পারেন। আবার আপনার কখনো মনে হবে আপনি আপনার কাজের ঈশ্বর। এবং কখনো আপনি শুধুই আপনার কাজের একটি সৃষ্টি যে টিকে থাকার জন্য লড়াই করছে। সঙ্গে সঙ্গে অর্থনৈতিক লাভবানের একটা ব্যাপার থাকে, আর এটা একটা উচ্চভিলাষী প্রকল্পকে ভুল পথে নিয়ে যেতে পারে, আবার মান নির্ধারণ করা হয় খুবই উচুতে, সব মিলিয়ে আমরা একটা ফাঁদে পড়ে যাই। আমি আসলে আমার নিজের নিয়মের মধ্যেই ফাঁদে পড়েছিলাম। আমি পেছনে ফিরে যেতে পারি না। আমি একটি দেয়ালকে আঘাত করি। যতক্ষণ না দেয়াল ভাঙতে পারি, আমি আঘাত করতেই থাকি ভাঙার জন্য। এবং শেষমেশ এটা হবে সম্পূর্ণ ঝড়ের মতো। এটা আসলে ম্যারাথন দৌড়। যেখানো থামার কোনো সুযোগ নেই। আপনাকে শেষ করতেই হবে। আপনি অনুভব করবেন যে, আপনি অসহায় কিন্তু আপনাকে শেষ করতেই হবে।
 
আপনার ক্যারিয়ার তো বিয়ের ওপর তাহলে প্রভাব ফেলবে?
আমি আশা করি খুব তাড়াতাড়ি আমার বিয়ে ভাঙছে না! (হাসি) এটা ছিল কঠিন। সত্যিই কঠিন। ছবি বানানো প্রচুর পরিমাণে জীবনের সময়কে দাবি করে। এবং আপনি সব মানুষ থেকে দূরে থাকবেন, যাদের আপনাকে খুব দরকার। এটা একজন চলচ্চিত্রকারের জীবনের আরেকটি সবচেয়ে কঠিন অংশ।
আপনি ‘রেভেন্যান্ট’ নিয়ে কাজ করছিলেন যখন আপনি ‘বার্ডম্যানে’র জন্য ইতিমধ্যে অস্কার পেয়েছেন। বলা যায় না এখন একটা বিরতি দরকার?
আমি দুটি ম্যারাথনে দৌড়েছি। সুতরাং এখন আমার বিরতি প্রয়োজন। সত্যি বলছি, আমি এখনও বুঝতে পারছি না ‘বার্ডম্যান’ ছবির সঙ্গে কী হয়েছিল! এটা ছিল খুবই উদ্ভট অবস্থা। আমার মনে হয়, আমার মাস দুয়েক বিশ্রাম দরকার। তাহলে আমি বুঝতে পারব গত আড়াই বছরে আসলে আমার কী হয়েছিল? সাধারণত দুই ছবির মধ্যে আমি দুই থেকে তিন বছর বিরতি নেই। সুতরাং এখন কেবল একটা জিনিসই আমি ভাবছি, আগামী তিন বছর আমার বিশ্রাম দরকার। সত্যিই এটা প্রয়োজন।
 
ভালো ও উচুমানের ছবির জন্য নিশ্চয়ই আরনন মিলচ্যানের মতো প্রযোজক দরকার, যিনি ‘বার্ডম্যান’, ‘দ্য রেভেন্যান্ট’, ‘ওয়ানস আপন আ টাইম ইন আমেরিকা’ ও ‘ব্রাজিল’ এর মতো ছবিতে অর্থ ঢেলেছিলেন?
অবশ্যই। ভালো ছবির জন্য একজন সাচ্চা শিল্পরসিক লোক লাগবে। যার থাকবে একটা আলাদা অনুভূতি। সঙ্গে সঙ্গে ভালো কাজের জন্য একরোখা টাইপের গুণ। এই সবগুলো একসঙ্গে যখন কাজ করে তখন একটা ভালো ছবি হয়।
চলচ্চিত্রে কি সবাই অর্থের দিকটাই বেশি ভাবে?
এ কারণেই সব সময় ভালো ছবি হয় না। কারণ বেশিরভাগ মানুষই যুক্ত হয় তাদের লাভ পাওয়ার জন্য। এবং যখন সবকিছু লাভের জন্য করা হয় তখন ছবিটা হয়ে যায় একটি পণ্য। আমি মনে করি না যে এ পরিস্থিতি আগেও ছিল না। এটা সবসময়ই ছিল কিন্তু মনে হচ্ছে এখন আগের থেকে বেশি হচ্ছে।
এমন কঠিন পরিবেশে শুটিংয়ের পরও আপনি কি ‘রেভেন্যান্টে’র মতো আরেকটি ছবি একইভাবে বানাতে চাইবেন?
এরকম পরিবেশে শুটিং করে কাজ শেষ করার জন্য আমার কোনো খেদ নেই। কিন্তু আমি ভাবি, আমি যা করি তার কোনো মূল্য নেই। আমি খুবই গর্বিত। কিন্তু এটা আমি বারবার করব না। এটা খুবই কঠিন ছিল। উচুমাত্রায় চাহিদাসম্পন্ন। সত্যি কথা বলতে কি আমি তখন শুধু টিকে থাকার জন্য কাজ করেছি। একজন চলচ্চিত্রকারের কাছে সেই সময়টা ছিল খুবই কঠিন ও চ্যালেজিং।
সে সময় কী আপনাকে আশা দেখিয়েছিল?
মাঝে মাঝে যখন আপনি বিশ্বাস হারিয়ে ফেলবেন এবং বুঝতে পারবেন যে এইভাবে কখনোই কাজটি করা সম্ভব না, যে স্বপ্ন আপনি দেখছেন। কিন্তু আপনি চেষ্টা করতে থাকবেন। হঠাৎ দেখবেন কোথায় যেন টিমটিম করে একটু আশার আলো জ্বলে উঠবেই। এবং সবকিছু আবার একত্রিত হতে শুরু করবে। যখন আপনি দিনের খুবই খারাপ সময়ের মধ্যে থাকবেন প্রচুর পরিমাণে হতাশা আপনাকে গ্রাস করবে কারণ কোনো কিছুই ঠিকভাবে হচ্ছে না। তখন কিন্তু আপনাকে হাল ছাড়লে চলবে না। দেখবেন হঠাৎ ঘটে গেছে। এটা বলা যায় একটা অতীন্দ্রীয় ব্যাপার আরকি।