চলচ্চিত্র: দহন
পরিচালক: রায়হান রাফি
কলাকুশলী: সিয়াম, পূজা, ফজলুর রহমান বাবু, মম
দেশ: বাংলাদেশ
সাল: ২০১৮
রেটিং: ৩/৫
হিসু ইস্যুতে মাত আর দহনে পোড়ার গল্প
শুক্রবার দুপুরে পুরান ঢাকার হাজির বিরিয়ানীতে গেছি প্রথমবার। খাওয়ার পর আমি স্বাদে মারাত্মক তুষ্ট, নামডাক এমনি এমনি হয়নি, আবার যাওয়ার ইচ্ছে আছে। এর কিছুক্ষণ আগেই বলাকায় দহন এর প্রথম শো দেখা হয়ে গেছে। খাওয়ার সময় ভাবছিলাম এমন দারুণ খাবার যে সিনেমার গানে তুলে আনা হয়েছে তা নিয়ে এত হইচই কেন হল, আর সিনেমা হলে তো গানটা শুনে খারাপ লাগেনি। পরে মনে হল, ‘হিসু করব দেয়ালে‘ টুকু বাদ দিয়ে ঢলে পড়বো দেয়ালে দিয়ে এ যাত্রায় দেশের পুরো গীতিকার সমাজের দাবি রক্ষা করা হয়েছে। অথচ আমার আশপাশে যারা আগের গানটি না পেয়ে কিছুটা ক্ষোভে হই হই আর শিস বাজালেন তাদের কাউকে আমার এতটা সুশীল মনে হয়নি। শো তে উপস্থিত আবদুল আজিজ সাহেবের তখন ঠোঁটে বাঁকা হাসি ছিল কিনা আমার জানা নেই, কারণ উৎসুক জনতাকে ডিঙিয়ে তার কাছে যাওয়া হয়নি। সিয়াম, পূজা, রায়হান রাফি কিংবা ফজলুর রহমান বাবুর আসামাত্র আশপাশের তরুণ তরুণীদের সেলফি তোলার যে আপ্রাণ চেষ্টা তা আমাকে পুরনো দিনে বাংলা ছবির স্টারডমকে মনে করিয়ে দেয় (যদিও আমি সে যুগের মানুষ না)।
এবার সিনেমার কথায় আসি। মুক্তির কথা ছিল দু সপ্তাহ আগে, ‘হিসু’ ইস্যুতে আলোচনা যখন তুঙ্গে তখন মুক্তি না দিয়ে বোধহয় ভালই হয়েছে। নেগেটিভ-পজিটিভ সব প্রচারণা শেষ করে মুক্তি পাওয়ায় রেন্টাল ভাল থাকার কথা, স্ট্যান্ডার্ড বজায় রাখতে জাজ এবারও ৪০ হল নিয়েই শুরু করলো। পোড়ামন ২ এর মতো ব্যবসা করবে কি-না তা সময় বলে দেবে, তবে একবাক্যে এটি ঢের ভাল ছবি। ট্রেইলার দেখেই যারা আমার মতো নিজেদের বোদ্ধা বনে গেছেন, তাদের ছবি না দেখলে বনের বাঘই খেয়ে ফেলতে পারে। যা বুঝলাম দহন জাজের বড় আদরের ছবি, মূল ভাবনায় আবদুল আজিজ, ছবি দেখে কেঁদেছে সিয়াম, পূজা জানান দিয়েছে সে লম্বা রেসের ঘোড়া আর রায়হান রাফি তো আগে থেকেই পছন্দ করেন দর্শককে নিয়ে খেলতে।
গল্প (স্পয়লারহীন)
মুক্তির আগে টিমের জন্য চ্যালেঞ্জ ছিল রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা এড়িয়ে অনেকগুলো সাবপ্লট (ছোট গল্প)কে একসাথে করা। কারণ, এখানে ছিল রাস্তায় বড় হওয়া তুলার সাথে তার কলিজা গার্মেন্টসকর্মী আশা, স্কুল পড়ে এমন বাচ্চা মেয়ে লক্ষ্মী ও তার পরিবার-যেখানে তার নার্স মা আর চাকুরে বাবা আছে, আছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সদ্য চান্সপ্রাপ্ত দারিদ্র পরিবারের অন্ধ মায়ের ছেলে, আছে সিনেমায় একটা চান্স পেতে মুখিয়ে থাকা মেয়ে, আছে হাসপাতালে পড়ে থাকা অসুস্থ মায়ের জন্য নিজের কিডনী বিক্রি করতে চাওয়া ছেলে, ছেলের টাকায় হজ্ব করতে যাওয়া ধর্মপ্রাণ বাবার মত নানামুখী চরিত্র।
বখাটে তুলা যে কিনা এলাকা দাপিয়ে বেড়ায়, দেয়ালে হিসু করে, লিডার বাবুর কথায় ভাংচুর আর নৈরাজ্য সৃষ্টি করতে পটু, বিনিময়ে সে পায় টাকা আর পুলিশের দৌড়ানি। সে আবার প্রেম করে আশার সাথে, চাইলে আশার গোসলখানায়ও ঢুকে পড়ে হবু শাশুড়ির চোখ ফাঁকি দিয়ে। তাঁদের ভালবাসার কমতি নেই, মাঝেমাঝে তারা প্রেমের বাক্স খুলে দিতেও দেরি করে না। দেশের অবস্থা ভাল না, চলছে অবরোধ আর তার মাঝে বাড়ছে জনমনে উত্তেজনা আর আশংকা। ছোট অপরাধ করতে থাকা তুলাকে এবার লীডার ট্রাম্পকার্ড বানায় পেট্রোল বোমা মেরে বড় ব্রেকিং নিউজ করতে। যা হবার তা-ই হয়, আগুনে পুড়ে ছাই হয় সেই মানুষগুলো, তাদের স্বপ্ন আর পরিবারকে দিয়ে যায় এক জীবন কান্না, পুড়ে যায় তুলার জান আশার মুখও, তার বেঁচে থাকা হয়ে পড়ে অনিশ্চিত। থানায় আত্মসমর্পণ করা তুলা প্রথমে বুঝতে পারেনি সে কি পাপ করে ফেলেছে। আর যখন বুঝতে পারে তখন সে সাংবাদিক মায়ার কাছে বলতে চায় একান্ত গোপন কিছু কথা। এই কথাগুলো আমাদের বোধহয় জানা খুব দরকার। তার জন্য যেতে হবে ছবিটি দেখতে, যা নেই আপনার সব বুঝে ফেলা ট্রেইলারেও।
ভাল আর মন্দ দিক
রায়হান রাফি যে মেসেজটি দিতে চেয়েছেন তা বোধহয় দিতে পেরেছেন, তবে যাদের হাতের কলকাঠি হয়ে তুলাদের এই পরিণতি তাদের সচেতনভাবে আড়াল করাটা আমার কাছে দূর্বল, কিন্তু চতুর দৃশ্যায়ন লেগেছে। সিয়াম এই ছবির প্রাণ, আমি হলে সিয়ামের জায়গায় আরেফিন শুভ, এবিএম সুমনকেও ভেবেছি কেমন হবে। তবে রাফ এন্ড টাফ পাগলামিতে সিয়াম যা করেছে তা তারা দেখলেও ভাল বলবে। আর বাকি রইল আবেগের দৃশ্য। আমরা লেখকেরা জানি মানুষকে হাসানো আর কাঁদানো কতটা কঠিন, স্ক্রিপ্টকে উতড়ে একটা সময় সিয়াম অনেক তরুণীকে প্রতিটি সংলাপে কাঁদিয়ে গেছে। মাত্র দ্বিতীয় ছবিতে সিনেমার এই আকালে এমন ডেডিকেশনকে আমি বলব লড়াইয়ের মত। তবে মম আর পূজা কে আমার খুব প্রভাব বিস্তারকারী মনে হয়নি। অভিনয়ে মম আর পূজা যার যার জায়গায় দূর্দান্ত তবে তাদের জায়গাটাই আমার কাছে শুধু মনে হয়েছে সিয়াম কে তুলে ধরতেই সৃষ্টি। পূর্ণিমা এ সিনেমা না করে বাধন করলেও তেমন কিছু আসতো যেতো বলে মনে হয়নি। ফজলুর রহমান বাবুর কন্ঠটা শুনতে হলেও ছবিটা দেখা দরকার, একটার পর একটা চরিত্রে নিজেকে এক্সপেরিমেন্ট করে দিন দিন তিনি আরো পোক্ত হয়ে যাচ্ছেন পর্দায়। আরেকটা ব্যাপার ছিল মাল্টিকাস্টিং । কে নেই ছবিতে? তারিক আনাম, রাইসুল ইসলাম আসাদ, শিমুল খান, সুষমা, শিল্পী সরকার অপু, মনিরা মিঠু, শহীদুল আলম সাচ্চু, জামিল, জাহিদ হাসান শোভন, পরিচালক সৈকত নাসির, রায়হান রাফি নিজেও। সবার উপস্থিতি দর্শককে ধরে রেখেছে পর্দায়।
পরিচালক প্রথম ছবির টিমটা অনেকটা ধরে রাখায় এক্সপ্রেশন, ড্রোন শট, কয়েদী সিয়ামের ক্লোজ শট, বোমা বিস্ফোরণসহ দৃশ্যায়ন ছিল বাস্তবসম্মত আর দারুণ উপভোগ্য। ডায়লগ রিপিট কম হলেও ঘটনা স্লো হয়ে যায় কিছু জায়গায়। তবে ভাল লাগেনি বিরতির পরে কিছু অংশকে টেনে লম্বা করাকে, আসলে শেষটা সিয়ামময় হয়ে যাওয়ায় আর কোন কন্টেন্ট ছিল না বোধহয়। গানের মধ্যে আমার প্রিয় সূফি ঘরানার রাব্বুল আলামীন। প্রেমের বাক্স অনেকটা ও হে শ্যামের কপি আর আমার সকাল কাটে খুব নতুনত্বের কিছু নেই। খাচার পাখি গানটা ভিন্ন স্বাদের ছিল আর হাজীর বিরিয়ানি নিয়ে বলাই বাহুল্য।
ছবিটি কেন দেখবেন?
যদি মোটা দাগে বলি-
১। গল্পটা আমাদের খুব চেনা প্রেক্ষাপটের, যে কেউ ছবিটি দেখতে পারে
২। নির্মাণ ভাল
৩। অভিনয় যার যার জায়গাতে যত্ন নিয়েই করেছে
৪। মনে নাড়া দিয়ে যাবে গল্পের ভাষাটি
৫। একইসাথে মৌলিক গল্প আর বিনোদনের সবকিছুই আছে