চলচ্চিত্র: মির্জা
পরিচালক: রাকেশ ওমপ্রকাশ মেহরা
কলাকুশলী: হর্ষবর্ধন কাপুর, শেয়ামি খের, ওম পুরি
দেশ: ভারত
সাল: ২০১৮
রেটিং: ২/৫

 

একটা ছেলে ও একটা মেয়ে একই স্কুলে পড়ে। দুজনের ক্লাসও একই। প্রতিদিন সকাল বেলা মেয়েটি ছেলেটিকে ডেকে নিয়ে যায়। মেয়েটি ধনী, ছেলেটি তাঁর থেকে একটু কম ধনী। প্রতিদিন একসঙ্গে যাওয়ায় দুজনের মধ্যেই গড়ে উঠেছে সখ্যতা। কখনো কখনো তা বদলে গেছে বিন্দু বিন্দু ভালোবাসায়ও। একদিন দুজন আলাদা হয়ে যায়। আর দেখা নেই। দুজন বেড়ে ওঠে দুই জায়গায়। যখন আবার দুজনের দেখা হয়, তখন তাঁরা বেশ বড়। কেউ কাউকে চিনতে পারে না। কিন্তু মনে মনে দুজনই পরস্পর খুঁজে বেড়ায় নিজেদের। একদিন তাঁদের মিলন হয়। কিন্তু তাঁরা ভালোবাসতে চায় একে অপরকে। ততক্ষণে সময় শেষ। তাদের দুজনের ভাগ্য লেখা হয়ে যায় দুইদিকে।

এমন তথাকথিত প্রেম কাহিনি ভারতীয় উপমহাদেশে হয়েছে অসংখ্যবার। নতুন সময়ে তা কেবল মোড়ক পাল্টেছে। আর বলিউড পরিচালক রাকেশ ওম প্রকাশ মেহরা তাঁর নতুন সিনেমার জন্য বেছে নিলেন এমন একটা গল্পই। খুব একটা জোয়ারও তুলতে পারেনি সিনেমাটি। রাকেশ যতটা বড় মাপের পরিচালক তাঁর সিকি ভাগও কথাবার্তা হয়নি সিনেমাটি নিয়ে। তবে আমি কেন দেখলাম? তাঁর একটি কারণ আছে। তাই নিয়ে আপনাদের সঙ্গে দু–চার কথা হবে। তা ছাড়া রাকেশের সিনেমা কথা না তুললেও দেখার আগ্রহ জাগে। কারণ এর আগে তাঁর হাতেই তৈরি হয়েছে রঙ দে বাসন্তি ও ভাগ মিলখা ভাগের মতো দুটো অনবদ্য সৃষ্টি।

সিনেমাটি মুক্তি পায় ২০১৬ সালে। আমি দেখেছি ২০১৮ সালে। মাঝখানে দুই বছরের বিরতি। আসলে সিনেমাটি দেখব কখনোই ভাবিনি। কিন্তু ইউটিউবে সিনেমাটির ট্রেলারে নামকরা সব উৎসবের লোগো দেখে দেখার ইচ্ছা হয়। সিনেমাটি ব্রিটিশ ফিল্ম ইনস্টিটিউট, শিকাগো ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভাল, বুসান ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের অফিসিয়াল সিলেকশন ছিল। তাই একদিন দেখে ফেলি। কিন্তু সিনেমাটি দেখে চলচ্চিত্র উৎসবগুলোর ওপর আস্থা হারাবার অবস্থাও এসেছিল। তবে এই সিনেমাটি দেখার একটাই কারণ থাকতে পারে—সেটি হলো, এর চিত্রগ্রহণ। এবং উৎসবগুলোতে সিনেমাটিকে পছন্দ করার এটাকেই কারণ হিসেবে অন্তত আমার কাছে ধরা দেয়।

গল্প ওমনই তথাকথিত। তাই গল্প নিয়ে আর বাগাড়ম্বর করতে চাই না। কেবল এতটুকু বলব, শিশুশিল্পীদের অভিনয়টুকু পর্যন্তই তরতরিয়ে চলে গল্পটি। সিনেমার মূল অভিনয়শিল্পীরা আসার পরেই ঝুলে যায়। এ ছাড়া এই গল্পের সঙ্গে আবার পৌরাণিক আরেকটি প্রেম কাহিনি অযথাই টেনে এনে গল্পটিকে যেন আরও জটিল করে তুলেছেন মেহরা। দুটি গল্পকে মিশিয়ে একটি গল্প বানানোতে ধার থাকতে হয়। মেহরা এই জায়গায় মোক্ষম ধরা খেয়েছেন। পৌরাণিক প্রেম কাহিনিটুকু বাদ দিলে সিনেমার গল্পে এতটুকু ক্ষতি হয় না। এবার আসি আসল জায়গায়। সিনেমার চিত্রগ্রহণ। এক কথায় বলিউডে এমন চিত্রগ্রহণ অসাধারণ। সাধারণত যেকোনো সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির একটি সাধারণ কাঠামো থাকে। তা অভিনয় থেকে শুরু করে চিত্রগ্রহণেও। বলিউডের সিনেমাগুলো দেখলেই বোঝা যায়, এটি বলিউডের প্রকল্প। ঠিক তেমনি ভারতের দক্ষিণী সিনেমা দেখলেও ওদের একটা কাঠামো ধরা যায়। কিন্তু এই সিনেমার অসাধারণত্ব এটাই যে, এই সিনেমার চিত্রগ্রহণ দেখলে কখনোই বুঝতে পারবেন না এটি বলিউডের সিনেমা। ক্যামেরার কাজ, শট নেওয়ার কৌশল, কম্পোজিশন, অ্যাঙ্গেল, সিনেমার রঙ, ওয়াইড শটে বিশাল ক্যানভাস তুলে ধরা—সবকিছু মিলে সিনেমার চিত্রগ্রহণ বলিউডের কাঠামো ভেঙে যেন অন্য এক মাত্রা গড়ে তোলে। এইখানেই মেহরার সার্থকতা ফুটে উঠে।

আর এই সফল চিত্রায়নের জন্য ধন্যবাদ দিতেই হবে সিনেমার চিত্রগ্রাহককে। যখন কোনো সিনেমার আলাদা কিছু নজরে আসে তখন ওই সিনেমার পেছনের কারিগরদের খুঁজে তাঁর সম্পর্কে জানা আমার একটি নেশা। সিনেমার চিত্রগ্রাহক সম্পর্কে একটু জানার চেষ্টা করি। ভদ্রলোক পোল্যান্ডের বাসিন্দা। নাম—পাওয়েল ডিলোস। ভদ্রলোক বেশ কটি সিনেমার চিত্রগ্রহণ করেছেন। তবে সিনেমাগুলো আমার কাছে অতটা পরিচিত না। তবে তিনি যে ভালো কাজ করেন, তাঁর একটি নমুনা হলো তাঁর প্রাপ্তি। পোলিশ সোসাইটি অব সিনেমাটোগ্রাফার তাঁকে ২০১৭ সালে সেরা চিত্রগ্রাহকের সম্মানে ভূষিত করে। বলে রাখি, আন্দ্রেজ ওয়াজদা, পাওয়েল পাভলিকোস্কি, রোমান পোলান্সকি, ক্রিস্তভ কিয়েসলোভস্কিরা যে দেশে সিনেমা বানান সে দেশের চিত্রগ্রাহককে একটু পাত্তা তো দিতেই হয়।

সিনেমাতে অভিনয় করেছেন একেবারেই নতুন একটি জুটি। অনিল কাপুরের ছেলে হর্ষবর্ধন কাপুর ও শেয়ামি খের। হর্ষবর্ধনের এটিই প্রথম সিনেমা আর শেয়ামির দ্বিতীয়। মেহরা তাদেরকে দিয়ে অভিনয় করিয়ে নিতে পারতেন। কিন্তু দুজনই খুবই সাদাসিদা অভিনয় করলেন। সিনেমার সংগীত করেছেন শঙ্কর এহসান লয়। এই ত্রয়ীকে বরাবরই ভালো লাগে আমার। তবে এই সিনেমায় যেন অযথাই বেশি বেশি গান দেওয়া হয়েছে। যদি মিউজিক্যাল হতো, তবে অন্য কথা। সম্পাদনা খারাপ লাগেনি। তবে পৌরাণিক ও বর্তমান এই দুসময়কে মেলাতে আরেকটু কৌশল দরকার ছিল। চিত্রগ্রহণ বাদে অন্য শাখায় খুব একটা ভালো রেটিং দিতে পারছি না রাকেশ ওমপ্রকাশ মেহরাকে।

যারা সিনেমাপ্রেমী। সিনেমার নানান খুঁটিনাটি দেখার জন্যও একটি সিনেমা দেখেন। তাদের জন্য এই সিনেমাটি দেখার অনুরোধ করব কেবল এটি বুঝতে, কেমন করে একটি কাঠামোবদ্ধ জিনিসকে ভেঙে নতুন জিনিস তৈরি করা যায়।