চলচ্চিত্র: মোগলি: দ্য লিজেন্ড অব জঙ্গল
পরিচালক: অ্যান্ডি সেরকিস
কলাকুশলী: রোহান চাঁদ, ম্যাথু রিস, ফ্রিদা পিন্টো, কণ্ঠ-ক্রিশ্চিয়ান বেল, বেনেডিক্ট ক্যাম্বারব্যাচ, কেট ব্ল্যানচেট, নওমি হ্যারিস
দেশ: আমেরিকা (নেটফ্লিক্স)
সাল: ২০১৮
রেটিং: ২.৫/৫
এক দঙ্গল তারকা নিয়ে নেটফ্লিক্স অরিজিনাল সিনেমা মোগলি: দ্য লিজেন্ড অব জঙ্গল। মোগলি নামট দেখেই নস্টালজিয়ায় পড়ে যাই। মনে পড়ে শৈশবে কমিক্সের পাতায় হাতির পিঠে মোগলিকে দেখে চোখ বড় বড় করে তাকাতাম। অপার বিস্ময়ে অত বড় হাতির পিঠে ছোট্ট মোগলি ওঠার ব্যাপারটি নিয়ে। কখনো কখনো নিজেকেও মোগলি ভাবতে একটুকু দেরি হত না। তবে ২০১৮ সালের এই ছবি অনেকখানি মানুষের সঙ্গে প্রাণীর সম্পর্কের কিংবা প্রাণীর চোখ দিয়ে মানুষের ভুলগুলো দেখিয়ে দেওয়ার এক ধরনের পায়তাঁরা।

গল্প: সিনেমার গল্পটি দেখে একটা ভাবনা নিশ্চয়ই জাগে বইকি। তবে তা বলতে গিয়ে গল্পকার নিজেই সাংঘর্ষিক কিছু বিষয় নিয়ে এসেছেন। সেসব নিয়েই থাকবে বয়ান। প্রথমেই বলে নেই, মোগলির গল্প খুবই সহজ। এক মানব শিশুকে জঙ্গলের প্রাণীরা লালন পালন করে। এক পর্যায়ে সে হয়ে ওঠে জঙ্গলের রাজা। কিন্তু মানব শিশু কেমন করে প্রাণীর সঙ্গে মিশবে। দুই ধারার দুটি স্পেসিসের বৈশিষ্ট্যকে একসঙ্গে আনতে গিয়ে মানুষের গলদগুলো দেখাতে চেয়েছেন গল্পকার। এটা খুবই ভালো একটি কৌশল। সরাসরি না বলে অন্যদের চোখ দিয়ে দেখালে বিষয়টা খুব ভালো করে হৃদয়ঙ্গম হয়।মানব শিশুটি জঙ্গলের প্রাণীর মাঝে বাস করার ফলেই প্রাণীদের প্রতি মানুষের অবিচারগুলো সেখুব ভালো করেই দেখতে পায়। যা হয়ত মানুষের মাঝে বাস করা কোনো মানব শিশু বুঝত না। এটি সবচেয়ে বেশি উঠে আসে, মোগলিকে সর্বক্ষণ পাহাড়া দেওয়া বাগিরার সংলাপ থেকে। মোগলিকে এক সময় মানুষেরা আটকে রাখে খাঁচায়। তখন তাঁকে দেখতে আসে বাগিরা। তখন বাগিরা আর মোগলির সংলাপে এটি উঠে আসে। ‘এক সময় সেও মানুষের কাছে বন্দী ছিল। তাঁর গলায় থাকা শেকলের দাগ দেখায় মোগলিকে। মোগলি মানব শিশু এটা জানত বাগিরা। একদিন সে মানুষের কাছে ফিরে আসবে, এটাও সে জানত। তাহলে সে কেন মোগলিকে জঙ্গলে লালন পালন করালো? এই প্রশ্নের জবাবে বাগিরার উত্তর ছিল। সে আসলে মোগলিকে এটা বোঝাতে চেয়েছে যে, প্রাণীদেরও জীবন আছে। তাদেরও স্বাধীনতা আছে। মানুষেরা চিড়িয়াখানায় প্রদর্শনী করার মতো করে আটকে রাখতে পারে না। তাদের জীবন নিয়ে তাঁরা যা–ইচ্ছা তাই করতে পারে না।’
পুরো সিনেমার মূল সুর এটাই। কিন্তু এটি দেখাতে গিয়ে পরিচালক ও গল্পকার উল্টাপাল্টা করে ফেলেছেন। প্রথম কথা হলো, প্রাণী ও মানব শিশু—দুটো স্পেসিসের সম্পর্ক নিয়ে কাজ করতে হলে দুটো স্পেসিসের প্রকৃতি নিয়ে কাজ করতে হবে। সেক্ষেত্রে ভিন্নতা দেখা গেছে। কারণ, জঙ্গলের প্রত্যেক ইতিবাচক চরিত্রের প্রাণীগুলোর ইমোশনগুলো নেওয়া হয়েছে মানুষের ইমোশনের মত করে। এমনকি মোশন গ্রাফিক্সে প্রাণীগুলোর চেহারা তাদের আবেগ অনুভূতির সময়ে যে পরিবর্তন দেখা যায়, তা একদমই মানুষের মতো। এমনকি নেতিবাচক চরিত্রের যে প্রাণীগুলোকে রাখা হয়েছে, তাদের এটিটিউডগুলোও একদমই বাজারি সিনেমার ভিলেনের মতো। এটি আরও নিশ্চিত হই, যখন দেখি অভিনয়শিল্পী ক্রিশ্চিয়ান বেল, কেট ব্ল্যানচেট, বেনেডিক্ট ক্যাম্বারব্যাচ, নাওমি হ্যারিসেরা কণ্ঠ দেওয়ার পাশাপাশি তাদের মোশনও নেওয়া হয়েছে। এরপর সিনেমার শেষের দিকে এসে নেতিবাচক চরিত্রের শের খানকেও কিন্তু মানব শিশু মোগলি মানুষের ব্যবহৃত অস্ত্র চাকু দিয়ে মেরে ফেলে। তাতে আশ্চর্য হয় না, প্রাণীকূল। আর এই প্রাণীরাই প্রথমবার যখন মোগলি আগুণ নিয়ে তাড়া করে শের খানকে তখন মোগলির বিরুদ্ধে ক্ষেপে উঠেছিল। কারণ প্রাণীরা হাতিয়ার ব্যবহার করে না। এটা জঙ্গলের নিয়ম বিরুদ্ধ। এমন নানা অসংগতি ছিল সিনেমার কায়াজুড়ে।

অ্যানিমেশন: ওয়ার্নার ব্রাদার্স হলিউডের বড় প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ও স্টুডিও। তাদের কাজে যত্নের ছাপ থাকবে এই স্বাভাবিক। অ্যানিমেশন বেশ পরিমিত ও ডিটেইল ছিল। তবে মাঝে মাঝে কিছু চরিত্রগুলোর কিছু কিছু ইমোশন ভারতীয় বলিউড ঘরানার মেলোড্রামাটিক ছিল। ওটুকু না রাখলেও হতো।

অভিনয়: অভিনয়ে সত্যিই কামাল করে দিয়েছেন মোগলি। রোহান চাঁদ প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য। অভিনয়ে আসলেও চন্দ্রমুখী এই অভিনয়শিল্পী। আর ক্রিশ্চিয়ান বেল, কেট ব্ল্যানচেট, বেনেডিক্ট ক্যাম্বারব্যাচ, নাওমি হ্যারিসদের কণ্ঠ অভিনয়ও বেশ ছিল। কখনো কখনো চড়া মনে হয়েছে।তবে অ্যানিমেশন যেহেতু অতটুকু অতিঅভিনয় মেনে নেওয়া যায়।

সবমিলিয়ে সিনেমাটি উপভোগ্য হবে এই বিশ্বাস। নেটফ্লিক্সের নিজস্ব প্রযোজনা এটি। কিছুদিন বাদে যে হলিউডের মূল ঘরানার সিনেমাগুলোকে টেক্কা দিবে তা বলা যায়।