চলচ্চিত্র: মান্টো
পরিচালক: নন্দিতা দাস
কলাকুশলী: নওয়াজুদ্দিন সিদ্দিকী, রাসিকা দুগাল, তাহির রাজ ভাসিন, দিব্য দত্ত

দেশ: ভারত
সাল: ২০১৮

রেটিং: ৩/৫

 

মান্টো নিয়ে হইচইয়ের অভাব নাই। এই চিল্লাচিল্লি কান অবধি গেছে। চিল্লাপাল্লা হলে কানে যাবে। এই স্বাভাবিক। তবে এই কান (কান চলচ্চিত্র উতসব, ফ্রান্স) সেই কান (কর্ণ) না। মজমায় বাঙালির আজীবন আগ্রহ। তাই যেই শুনছে সিনেমাটি বাংলাদেশে এসছে, অমনি সব হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। এই সিনেমার চাইতেও ঢের ভালো সিনেমা ঢাকার আনাচে কানাচে প্রদর্শিত হয়। বার্গম্যান তারকোভস্কি কাইন্দ্যা মরে। মাছিটাও পাওয়া যায় না। আর এই সিনেমার টিকিট নিয়া সেকি কাড়াকাড়ি। দেখলে গা জ্বলে।

আসেন মান্টো নিয়া কথা পাড়ি। কান অবধি সিনেমা গেছে। হুজুগে বাঙালির মতো আগ্রহটা আমারও কম ছিল না। ভিড়ভাট্টা ঠেলে প্রায় দুই ঘণ্টার সিনেমা খাড়াইয়া দেখলাম। ফল কি মিলছে? আমার বক্তব্য না। ঘুরে ফিরে ফিরাক-ই যেন দেখলাম। ২০০৮ সালে নন্দিতা দাসের বড় দৈর্ঘ্যরে সিনেমায় হাতেখড়ি। সিনেমার নাম ফিরাক। ২০০২ সালের গুজরাট দাঙ্গা নিয়ে সিনেমার প্রেক্ষাপট। একজন উচ্চাঙ্গসংগীত শিল্পীর জীবনের ওপর ভর করে নান্দনিকভাবে বলে গিয়েছিলেন গল্পটি। সিনেমার হাতেখড়িতেই কামাল করে দিয়েছেন। ধর্ম নিয়ে উপমহাদেশের রাজনীতি ও মানস উঠে এসেছিল কড়াভাবে। এরপর আর সিনেমায় হাত দেননি তিনি। টানা দশ বছরের বিরতি। ২০১৮ তে এসে তৈরি করলেন মান্টো। প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক সাদাত হাসান মান্টোর জীবনী। আগ্রহ তাই সবার ছিল তুঙ্গে। এই স্বাভাবিক। উপমহাদেশের সাহিত্য নিয়ে আগ্রহ যাদের তাদের কাছে নামটি অপরিচিত নয়। তা ছাড়া মান্টোর বৈচিত্রময় জীবনও এই সিনেমার মূল আকর্ষণ। মান্টোকে বড় পর্দায় দেখতে যার আগ্রহ জাগবে না, এই সময়ে তাকে বনবাসী আমরা ভাবতে পারি।

নন্দিতা দাস সেই মান্টোকে পর্দায় নিয়ে এলেন। মান্টোকে পর্দায় আনাতো এত সহজ কাজ নয়! মান্টোর সঙ্গে আছে তাঁর হাজারটা আত্মীয়। আছে তাঁর সাহিত্যের বৈচিত্র্যে ভরপুর চরিত্ররা। বোম্বের ততকালীন সিনেমা পাড়া। কত কী! কিন্তু মান্টো কি এলো এসব নিয়ে? নাকি নন্দিতা দাস পুরোনো ফিরাককেই ফিরিয়ে আনলেন আরেকবার। শুধু পটভূমি ভিন্ন। এক উচ্চাঙ্গ সংগীত শিল্পীর জায়গায় বসিয়ে নিলেন এক সাহিত্যিককে। আর গুজরাটের দাঙ্গার বদলে বললেন দেশভাগের আবেগি কথা। এ কথা সত্যি, মান্টোর বেশিরভাগ সাহিত্য ও জীবন পুড়েছে দেশভাগের যন্ত্রণা নিয়ে। ঠিক ভারতীয় চলচ্চিত্রকার ঋত্বিক কুমারের মতো। দুজনেরই সঙ্গে ছিল মদ। তবু মান্টো চলচ্চিত্রে মান্টো এল? নাকি মান্টোকে দিয়ে নন্দিতা দেশভাগের কথা বললেন। তাও এই আবেগি কথা? এগুলো তো ইতিহাস, জনপ্রিয় ধারার সিনেমায় দেখতে দেখতে ক্লান্ত। ভারতীয় এক প্রখ্যাত চিত্রকরের মেয়ের কাছে এর থেকে বেশি কিছু কি আশা করা যায় না? ২০০৮ সালের পর ২০১৮ তে এসে সিনেমা বানালেন। নন্দিতা নিলেন ১০ বছর। এই দশ বছরে নন্দিতার কাছে আরও বেশি কিছু প্রত্যাশা করি যে। দেশভাগ নিয়ে আবেগের ঘনঘটা তো বাজারি সিনেমায় অজস্র আছে। আবার নতুন করে কেন মান্টোর বয়ানে শুনতে হবে? যদি মান্টোর জীবনী না দেখাতে চান, দেশভাগই দেখাতে চান, তাহলে তা-ই বলতেন, মান্টোর চোখে দেশভাগ। গোটা মান্টো কি একটা দেশভাগ? তাঁর অন্য কোনো জীবন নেই? মান্টোকে অত ভেতরে পড়তে পারলেন না নন্দিতা! আর যদি দেশভাগই দেখাতে চান, তবে তার একটি বিশ্লেষণ তো চাই। একই কথা কেন শুনতে যাব আবার? বলুন।

কান চলচ্চিত্র উতসব একটা বড় বাজার। ওখানে কোন সিনেমা নিয়ে যে কী আলাপ হয় বোঝা বড় দায়। এই সিনেমাটি সিনেমা হিসেবেই প্রদর্শিত হলো, নাকি মান্টোর নামেই কাটলো কে জানে? নন্দিতা দাস বড্ড হতাশ করলেন। প্রথম সিনেমার ১০ বছর পরে এসে সেই প্রথম সিনেমাটাই দেখতে চাইনি। অন্তত আপনার কাছে। সিনেমার গল্প নিয়ে একটা বড্ড ঘাপলা থেকে গেল।

অভিনয়ে সবাই নওয়াজের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। খানদের মতো তাঁর অবস্থা। যা-ই করেন হিট তকমা লেগে যায়। বড় অভিনেতা হওয়ার এই একটা মুশকিল। হিট হয়েছেন তো ধরা। সেরা অভিনয়ের কথা কেউ বলবে না। বলবে না, আহা নওয়াজের ওই দৃশ্যটা মনে লেগে আছে। বলবে, ওহ নওয়াজ। কী বলব, হে হে, আগের মতোই উড়িয়ে দিয়েছে। আমি বলি, নওয়াজ আপনি গ্যাংস অব ওয়াসিপুরেই সেরা। অন্য সবাই চলে যায়। তবে এই সিনেমায় একজনের অভিনয়ের কথা না বললে অবিচার করা হবে। যার দৃশ্যটি সত্যিই গেঁথে যাওয়ার মতো। খুব ছোট্ট। কিন্তু ওটুকুতেই মাত করে দিয়েছেন। দিব্য দত্ত। যেটুকু অভিনয় করলেন, মান্টো সিনেমা হতে ওইটুকুই ঘরে নিয়ে ফিরলাম।

তবে এই সিনেমার একটা শক্তির জায়গা, এর সংলাপ। একটি শক্ত বিষয় হলেও সংলাপ অত খটমট ছিল না। মান্টোর ছোট গল্পগুলোকেই এক করে যেহেতু সিনেমার চিত্রনাট্য করা, তাই সাহিত্যের একটা প্রভাব থাকবে এই স্বাভাবিক। গল্পবলায় নন্দিতা চতুরতার পরিচয় দিয়েছেন। আধুনিক সব যন্ত্রপাতির ব্যবহার করিয়েছেন বেশ ভালোভাবে। তাই পর্দায় সিনেমাটি বেশ ঝা চকচকে। তবে বাজার বলে কথা। সেদিকে নজর দিতেই হয়তো ভুলে গিয়েছিলেন সিনেমার দগ দগে ঘায়ের কথা। তবে বেলা তররা (হাঙ্গেরিয় পরিচালক) কিন্তু ভোলেন না। ২০১১ সালেও তারা সাদাকালো সিনেমা বানান।