চলচ্চিত্র: রাজমা চাওয়াল
পরিচালক: লীনা যাদব
কলাকুশলী: ঋষি কাপুর, অনিরুদ্ধ তানওয়ার, আমরা দাস্তুর
দেশ: ভারত
সাল: ২০১৮
রেটিং: ২.৫/৫

 

রাজমা চাওয়াল—ভারতীয় সুস্বাদু এক খাবার। পরিচালক লীনা যাদব সিনেমার নাম দিয়েছেন এই খাবারের নামে। সিনেমা কি ততটা সুস্বাদু হয়েছে? নাকি মরিচ খানিকটা কম, লবণ হয়ে গেছে একটু বেশি, ঝোলটা আরেকটু তাপ দিলে জিভে জল চলে আসত? চলুন না রেসিপিটা নিয়ে খানিক বাতচিৎ করি।

গল্প: প্রথম আসি সিনেমার বিষয় নিয়ে। পরিচালক লীনা যাদবের গল্পের বিষয়টি খুবই নবীন ও সমসাময়ীক। এই বিষয় নিয়ে একটি ভালো সিনেমা হতে পারে। বলিউডের মেলোড্রামার কোল ঘেঁষে এমন সিনেমা বিষয় নিয়ে সিনেমা তৈরি নিঃসন্দেহে প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য। এই সিনেমার গল্প নেওয়া হয়েছে দুই প্রজন্মের সম্পর্ক নিয়ে। একটি প্রজন্ম পড়ে গেছে প্রযুক্তির বাইরে। তাই তাদের চিন্তাও প্রযুক্তির বাইরে দিয়ে হাঁটে। অন্যদিকে নতুন প্রজন্ম একেবারেই বুঁদ ফেসবুক টুইটার ইনস্টাগ্রামে। এই দুই প্রজন্মের দ্বন্দ্বের উপর ভিত্তি করে সিনেমার গল্পটি সাজিয়েছেন পরিচালক। গল্পটিতে দেখা যায় পুরান দিল্লির মানুষ রাজ মাথুর। স্ত্রী মারা যাওয়ার পর তিনি চলে এসেন নতুন দিল্লি ছেড়ে। এখানে তিনি যেন তাঁর শৈশবের সবকিছু খুঁজে পান। মেতে উঠেন অন্য আনন্দে। অন্যদিকে তার ছেলে কবির মাথুর একেবারেই আলাদা। নতুন দিল্লি ছেড়ে আসায় যারপরনাই বিরক্ত সে। পুরোনো দিল্লির সবকিছু তার কাছে বিরক্ত লাগে। বাবা ও তার আত্মীয় স্বজনের কাছ থেকেও সে দূরে দূরে থাকে। বাবা এই দূরত্ব ঘোঁচাতে আশ্রয় নেয় ফেসবুকের। তাঁকে ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট পাঠায়। কিন্তু তা গ্রহণ করে না ছেলে কবির। এবার বাবা একটি মেয়ের ছবি দিয়ে ফেক আইডি দিয়ে ছেলেকে রিকোয়েস্ট পাঠায়। ছেলে সহজেই তা গ্রহণ করে। বাবা ছেলের মধ্যে কথাবার্তা শুরু হয়। হঠাৎ একদিন একটি কনসার্টে বাবা যে মেয়ের ছবি দিয়ে আইডি খুলেছে তার দেখা পায় কবির। কিন্তু মেয়ে এই অ্যাকাউন্টের বিষয়ে কিছুই জানে না। শুরু হয় নতুন সংকট। এই সংকট নেভাতে গিয়েই বাবা ছেলের এই সময়ের সম্পর্কের টানাপোড়েন দেখিয়েছেন পরিচালক। কীভাবে? তার জন্য সিনেমাটি দেখতে হবে।

গল্প বলার ধরণ: গল্প বাছাইয়ে যতটা প্রশংসা কুড়িয়েছেন লীনা ততটাই বাজে রেটিং করা যেতে পারে গল্প বলার ঢং নিয়ে। এই সময়ের গল্পটি এই সময়ের বাস্তবতার নিরিখেই বলা যেত। কিন্তু গল্পটি বলতে গিয়ে এমন নাটুকেপনা করা হলো বাস্তব বিষয়ের গল্পটি থেকে বাস্তবতাটাই যেন কোথায় হারিয়ে গেল। এই সময়ে বাবা ও ছেলের দ্বন্দ্বের মূল প্লট ছিল প্রযুক্তি। সেই প্রযুক্তি ঘিরে বাবা ও ছেলের সম্পর্কে বাস্তবতাকে নিয়ে একটি কাল্পনিক গল্প দাঁড় করানো যেত।সেটা বাদ দিয়ে একটা অতিনাটুকেপনা গল্প বললেন লীনা। যেখানে গল্পটা মূল প্লট থেকে মাঝে মাঝে বাইরে গিয়ে আছড়ে পড়ল। আমরাও দুই প্রজন্মের দ্বন্দ্ব থেকে মাঝে মাঝে এদিক ওদিক যেন ঘুরে এলাম।

অভিনয়: ঋষি কাপুর বুঝিয়ে দিয়েছেন যৌবনে অভিনয়ের ধাতটা বেশ ভালোই ছিল। এই ছবিতেও কম যাননি। তরুণ অভিনয়শিল্পীদের পাশাপাশি একদমই তাল মিলিয়ে অভিনয় করেছেন। এই ছবিতে ঋষি কাপুর ছাড়া আর কেউ অতটা চেনা নন। তবু খুব একটা খারাপ লাগেনি। সবাই চলে যাওয়ার মতো অভিনয় করেছেন। অবশ্য মনে দাগ কাটার মতোও কোনো দৃশ্য তৈরি হয়নি।

সংলাপ: মনে রাখার মতো কোনো সংলাপ কানে বাজেনি। একদমই গতানুগতিক। একটা কথা বলে রাখি। এটি নেটফ্লিক্সের অরিজিনাল সিনেমা। অর্থাৎ ওরাই প্রযোজনা করেছে। মুক্তিও দিয়েছে ওদের সাইটে। নেটফ্লিক্স অরিজিনাল আমি যতগুলো সিনেমা দেখেছি তার মধ্যে একটা বিষয় আমার কাছে খুব ভালোভাবে ধরা দিয়েছে। সেটা হলো নেটফ্লিক্সের সিনেমাগুলোর গভীরতা কম। কেমন যেন প্রাণ নেই। কারণ লীনা যাদবেরই সিনেমা পার্চড এর তুলনায় এই সিনেমা নেহাতই শিশুতোষ।

নান্দনিকতা: যেকোনো শিল্পেই নান্দনিকতা একটা বড় ব্যাপার। সিনেমার কথা বলতে গেলে এই বিষয়টি এড়াতেই পারি না। গল্প বলার ঢঙ, চিত্রগ্রহণ, অভিনয়, দৃশ্যায়ন—সবকিছুর মধ্যে একধরণের সৌন্দর্য্য থাকে। যা সিনেমাটিকে কখনো কখনো অপূর্ব ভালোলাগার জায়গায় নিয়ে যায়। সেটা হতে পারে খোলা আকাশে একটি পাখি উড়ে যাওয়াও। এই সিনেমায় এত ঘটনার ঘনঘটা। এত এত কাজ আর কথার ভীর। ওই একটু খানি খোলা আকাশে পাখি উড়ে যাওয়ার মতো অবসর নেই।

কেন দেখব: এই কথাবার্তায় একটি বিষয় পরিস্কার হয় যে, এই সিনেমাটি ঠিক মনঃপুত নয়। তবে কেন দেখবেন? দেখার একটি বড় কারণ হলো সিনেমার বিষয়। ওই যে আগেই বলেছি, বিষয়টা এতটাই সমসাময়িক ও বাস্তব যে আপনাকে এই বিষয়ের সিনেমা দেখা উচিত বলে মনে করি। তা ছাড়া এই কথাগুলোতো আমার। আমার রুচি আর আপনার রুচি এক হবে—তারই বা নিশ্চয়তা কী? আমার পছন্দ তো গরম সাদা ভাতে সর্ষে তেলে মাখানো আলু ভর্তা। আপনার তো রাজমা চাওয়ালও হতে পারে, নাকি?