মৃণাল সেন

পরিচালক, ভারত
নীল আকাশের নিচে (১৯৫৮), বাইশে শ্রাবণ (১৯৬০), পুনশ্চ (১৯৬১), অবশেষে (১৯৬৩), প্রতিনিধি (১৯৬৪), আকাশ কুসুম (১৯৬৫), কলকতা ট্রিলজি—ইন্টারভিউ (১৯৭০), কলকাতা ৭১ (১৯৭২) , পদাতিক (১৯৭৩)।
প্রাথমিক জীবন
মৃণাল সেন ১৯২৩ সালের ১৪ মে বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। ফরিদপুরে উচ্চমাধ্যমিক শেষ করার পর তিনি কলকাতায় চলে যান। সেখানে তিনি পদার্থ বিদ্যায় উচ্চশিক্ষা পড়ার জন্য চলে যান। তারপর কলকাতার স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন।
ছাত্রজীবনে থাকা অবস্থায়ই তিনি বাম ঘরানার সঙ্গে যুক্ত হন। যদিও তিনি বাম দলের কখনো সদস্য হননি। তবে পিপলস থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। যা তাঁকে বাম ঘরানার লোকজনের সঙ্গ পেতে সাহায্য করে।

চলচ্চিত্র জীবন
চলচ্চিত্র নিয়ে মৃণাল সেনের প্রথমদিকে আগ্রহ দেখা যায়নি। চলচ্চিত্রের নন্দনতত্ত্ব নিয়ে একটি বই পড়ার পর তিনি চলচ্চিত্রের দিকে আগ্রহী হন। যাই হোক চলচ্চিত্রের দিকে তাঁর আগ্রহ হলেও তাঁর মূল আকর্ষণ ছিল চলচ্চিত্রের বুদ্ধিবৃত্তিক দিকে। প্রথম দিকে তিনি মেডিকেল রিপ্রজেন্টিটিভ হিসেবে কাজ শুরু করেন। এজন্য তাকে কলকাতার থেকে দূরে চলে যেতে হয়। কিন্তু এখানে বেশি দিন তিনি কাজ করতে পারেননি। তাই চাকরি ছেড়ে দিয়ে ফের শহরে ফিরে আসেন। শহরে এসে তিনি কলকাতার একটি চলচ্চিত্র স্টুডিওতে অডিও টেকনিশিয়ান হিসেবে কাজ শুরু করেন। এভাবেই তাঁর চলচ্চিত্র জীবনের শুরু হল।

রাতভোর সিনেমা পরিচালনার মধ্য দিয়ে তাঁর সিনেমা জীবন শুরু হয়। কিন্তু নীল আকাশের নিচে সিনেমা দিয়ে তিনি প্রথম নজরে আসেন। আর তৃতীয় সিনেমা বাইশে শ্রাবণ তাঁকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এনে দেয়। এরপরেই একেএকে তিনি অসাধারণ সব চলচ্চিত্র বানাতে শুরু করেন।

প্রথম দিকের সিনেমা বানানোর পরে তাঁর সিনেমাগুলো হতে থাকে অনেক বেশি রাজনৈতিক সচেতন। এবং একজন মার্ক্সিস্ট শিল্পী হিসেবে পরিচিত হতে থাকেন। এবং আন্তর্জাতিকভাবেও তিনি মহান চলচ্চিত্র¯্রষ্টা হিসেবে পরিচিতি পেতে থাকেন। তিনি হয়ে ওঠেন সত্যজিত রায় ও ঋত্বিক ঘটকের সমান্তরাল নির্মাতা। কলকাতার তিনজন মহান চলচ্চিত্রকার হিসেবে এই ত্রয়ী পরিচিত হতে থাকেন বিশ্বজুড়ে।

মৃণাল সেন একেরপর এক নীরিক্ষামূলক চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে থাকেন। শেষ দিকে এসে তিনি তাঁর নিয়মিত চলচ্চিত্র বানানোর ধারা ন্যারেটিভ ফিল্ম থেকে সরে এসে খুবই সহজ গল্প নিয়ে সিনেমা বানানো শুরু করেন। আট বছর বিরতি দিয়ে ২০০২ সালে তিনি নির্মাণ করেন সিনেমা আমার ভুবন।

পুরস্কার
মৃণাল সেন বিশ্বের নামকরা সব চলচ্চিত্র উতসবের পুরস্কার ঘরে তুলেছেন। সেসব উতসবে প্রদর্শীত হয়েছে তাঁর সিনেমা। কান, বার্লিন, ভেনিস, মস্কো, কার্লোভ ভ্যারি, মন্ট্রিল, শিকাগো ও কায়রোসহ সেরা সেরা উতসবে প্রদর্শীত হয়েছে।
এ ছাড়াও তিনি অন্য অনেক পুরস্কার লাভ করেছেন। তিনি ভারতের পদ্ম ভূষণ, দাদা সাহেব ফালকে পুরস্কার লাভ করেন। তিনি ভারতীয় সংসদের অবৈতনিক সদস্য ছিলেন (১৯৯৮-২০০৩)। ফরাসি সরকার তাঁকে কমান্ডার অব দ্য অর্ডার অব আর্টস অ্যান্ড লেটারস এ ভূষিত করেন। রাশিয়া সরকার অর্ডার অব ফ্রেন্ডশীপ সম্মাননা দেন। নানা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাঁকে ডক্টরেট ডিগ্রি দিয়ে সম্মানীত করেন। তিন ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব দ্য ফিল্ম সোসাইটিজের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি বিভিন্ন উতসবের বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কান, বার্লিন, ভেনিস, মস্কো, কার্লোভ ভ্যারি, শিকাগো, টোকিও, তেহরান ইত্যাদি।

২০০৪ সালে মৃণাল সেন লিখে ফেলেন তাঁর জীবনী। নাম অলওয়েজ বিং বর্ন। এরপর তিনি জীবনের শেষ দিকে নানা উতসবে আজীবন সম্মাননা লাভ করেন। ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বও এই মহান চলচ্চিত্রকার মারা যান।

কাজ
মৃণাল সেন ২৭টি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র, ১৪টি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র, ৫টি প্রামাণ্যচিত্র তৈরি করেন। তাঁকে নিয়েও কয়েকটি প্রামাণ্যচিত্র তৈরি করা হয়। চলচ্চিত্র নিয়ে তিনি বেশ কিছু বইও লিখেছেন।

প্রথম চলচ্চিত্র: রাতভোর (১৯৫৫)
শেষ চলচ্চিত্র: আমার ভুবন (২০০২)
চলচ্চিত্র: নীল আকাশের নিচে (১৯৫৮), বাইশে শ্রাবণ (১৯৬০), পুনশ্চ (১৯৬১), অবশেষে (১৯৬৩), প্রতিনিধি (১৯৬৪), আকাশ কুসুম (১৯৬৫), কলকতা ট্রিলজি—ইন্টারভিউ (১৯৭০), কলকাতা ৭১ (১৯৭২) , পদাতিক (১৯৭৩), এক আধুর কাহিনি (১৯৭১), কোরাস (১৯৭৪), মৃগয়া (১৯৭৬), পরশুরাম (১৯৭৮), একদিন প্রতিদিন (১৯৭৯), আকালের সন্ধানে (১৯৮০), খারিজ (১৯৮১), খন্দর (১৯৮৩), জেনেসিস (১৯৮৬), একদিন আচানক (১৯৮৯), মহাপৃথিবী (১৯৯১), অন্তরীন (১৯৯৩) ইত্যাদি।
বাংলা বাদে অন্য ভাষার চলচ্চিত্র: মাটির মনীষ (ওড়িয়া, ১৯৬৬), ভুবন সোম (হিন্দি, ১৯৬৯), ওকা উরি কথা (তেলেগু, ১৯৭৭)