চলচ্চিত্র: যদি একদিন
পরিচালক: মুহাম্মদ মোস্তফা কামাল রাজ
কলাকুশলী: তাহসান খান, শ্রাবন্তী, তাসকিন আহমেদ, রাইসা প্রমুখ
সাল: ২০১৯
দেশ: বাংলাদেশ

রেটিং: ২.৫/৫

 

সেদিন সোমবার। আমি আর আমার এক বন্ধু যাই বলাকা সিনেমা হলে। সিনেমা হলের বাইরে টানানো বড় ব্যানার। তাতে আঁকা সংগীতশিল্পী তাহসান খানের ছবি। আছেন কলকাতার নায়িকা শ্রাবন্তী, বাংলাদেশের অভিনেতা তাসকিন আহমেদ ও শিশুশিল্পী রাইসা। ব্যানারে বড় করে লেখা ‘যদি একদিন’। বলে রাখি এটি সিনেমার নাম।

আসুন আগেই সিনেমাটির ভালো দিকগুলো নিয়ে আলাপ করি। এই ছবির সবচেয়ে ভালো দিক হলো অভিনয়শিল্পীদের সাবলীল অভিনয় করার প্রাণান্তকর চেষ্টা। ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্রগুলো যেমন—তাহসান খান, শ্রাবন্তী, তাসকিন আহমেদ, রাইসা; প্রত্যেকে যার যার জায়গায় সাবলীল অভিনয়ের চেষ্টা করেছেন। মাঝে মাঝে অতি নাটুকেয়তা ও অতি এক্সেপ্রেশন থাকলেও খুব একটা খারাপ ঠেকেনি। বিশেষ করে রাইসা ও তাহসানের অভিনয়কে সাধুবাদ জানাতে হয়। তাহসান সংগীতশিল্পীর পাশাপাশি অভিনেতা। সেই দিক হতে কে বলবে? মারদাঙ্গা অভিনেতাদের মতোই সাবলীল হওয়ার চেষ্টা করেছেন। একটি গণমাধ্যমে তিনি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, দর্শক গ্রহণ করলে তবেই তিনি থাকবেন। আমরা দর্শকেরা বলতে পারি, তাহসান আপনি অভিনয়ে থাকতে পারেন আমৃত্যু। তবে এই সিনেমার মূল প্রাণ শিশুশিল্পী রাইসা। রাইসার সাবলীল অভিনয় মুগ্ধ করেছে। সেই সঙ্গে তাঁর পাকামো চরিত্রটি যেন আজকের বাস্তব সমাজ থেকেই উঠে আসা। না হলে আমার পাশে বসা দর্শকটি বলেন? `দেখ মেয়েটা একদম আমাদের ভাতিজির মতো পাকা‘। শ্রাবন্তী কলকাতার পেশাদার অভিনেত্রী। তাই তাকে নিয়ে কিছু বলার নেই। চরিত্রটির মধ্যে অভিনয়ের তেমন একটা জায়গা নেই বলে অভিনয়ে তেমন কিছু পাওয়া যায়নি কলকাতার এই সুন্দরীর কাছ থেকে। ঢাকা অ্যাটাক দিয়ে বেশ আলোচনায় এসেছেন তাসকিন আহমেদ। এই প্রথম কোনো ভিলেন চরিত্র নায়ককে ছাপিয়ে গিয়েছিল। তাসকিন সেটি পেরেছেন। এই ছবিতেও তাঁর চেহারার মুখভঙ্গি বলে দেয়, অভিনয়টা সুপ্ত আছে তার ভেতর। কেবল পাকা হাতে সেটি বের করার অপেক্ষায়। তাসকিনের সংলাপ বলাটা যাত্রার ঢঙে না হলে ভালোই হতো। অভিনয় নিয়ে আর কাউকে নিয়ে বলার দরকার আছে বলে মনে হয় না। তবে মা চরিত্রে রূপদান কারী চোখে পড়েছেন।

আসুন এবার গল্প নিয়ে কিছু বলা যাক। স্পয়লার হয় এমনভাবে গল্প বলতে বারণ আছে। তাই কেবল সিনেমার বিষয়গুলো নিয়ে আমরা আলাপ করব। বন্ধুত্ব, ভালোবাসা, দায়িত্ব আর বাবা-মেয়ের সম্পর্কের এক দারুণ রসায়ন করেছেন পরিচালক মোস্তফা কামাল রাজ। কিন্তু এতকিছু একগল্পে দেখাতে গিয়ে কিছুটা তালগোল পাকিয়ে ফেলেছেন। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি সিনেমা নির্মাণ করলেও সিনেমায় গল্প বলার ভঙ্গি আর সিনেমার বড় ক্যানভাসটা মনে হয় এখনো অজানা রাজের কাছে। তাই এত বিষয় নিয়ে গড়া গল্পটি জীবনের ভেতরের অনেকগুলো দৃশ্য না হয়ে, জীবনের অনেক গভীরে না গিয়ে, উপরে উপরে আবেগ দিয়ে শেষ হয়ে গেল। নাটকের নাটুকেপনাটা রয়ে গেল সিনেমার গায়ে। তাই সিনেমা হলের মধ্যে কেউ টেলিছবি বলে ফেললে নিশ্চয়ই রাগ করবেন না রাজ।

বাংলাদেশে যারা নাটক থেকে সিনেমায় এসেছেন, তাদের গল্প বলার ঢঙ নিয়ে প্রথম থেকেই প্রশ্ন থেকে গেছে। সিনেমার ভাষাটা ঠিক যেন বাগে আনতে পারছেন না তারা। এই ফাঁকটা কোথায়? তা আমরা দর্শকেরা বলতে পারব না। তা তাদেরই খুঁজে বের করতে হবে। আমরা এইটুকু বলব শুধু, কোথায় যেন অতৃপ্তিটা থেকে যায়। তবে এটা ঠিক সারা বছর একটি মাধ্যমে কাজ করার মাঝে একটি সিনেমা বানাতে গেলে তার মধ্যে গরমিল কিছুটা হয়ে যায়, ওই মাধ্যমের প্রভাব পড়বে এই স্বাভাবিক। তবে রাজের অন্য সিনেমাগুলোর থেকে যে তিনি বেশ উন্নতি করেছেন এটা চোখে পড়ার মতো।

চিত্রগ্রহণে আহামরি বলার কোনো কিছু নেই। সংগীত ও শব্দ বেশ কানকে ভুগিয়েছে। পরিচালক সংগীতের ক্ষেত্রে পরিমিতির জায়গাটা খেয়াল করেননি বোধ হয়। সবকিছু মিলে ভালো খারাপের একটা মিশেল বলা যায় যদি একদিন সিনেমাটিকে। আমি বলব সিনেমাটি দেখতে যান। আমি দেখেছি। সময়টা বিফলে যায়নি। চলচ্চিত্রে যেভাবে একের পর এক সিনেমা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, তাতে কিছুদিন পর সিনেমা ব্যাপারটির কথাই আমরা ভুলে যাব। আমরা অন্তত ঢিসুম ঢিসুম ঘরানার সিনেমা থেকে বের হয়ে, নতুন একটা ঘরানা পেয়েছি, যারা আমাদের সিনেমা হল বাঁচিয়ে রাখার আশা জাগায়। এটাই কম কিসে। `যদি একদিন‘ জোটে, সিনেমা হলে যান, দেখে আসুন।