চলচ্চিত্র: মাটির প্রজার দেশে
পরিচালক: ইমতিয়াজ আহমেদ বিজন
কলাকুশলী: মাহমুদুর অনিন্দ্য, রোকেয়া প্রাচী, শিউলি আখতার জারিন, জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়
দেশ: বাংলাদেশ
সাল: ২৩ মার্চ ২০১৮
রেটিং: ৮.৫/১০
দশ বছর বয়সী জামাল ও সমাজের বিভিন্ন অসঙ্গতির চিত্র যেন সিনেমাটি জুড়ে। মাটির প্রজার দেশে ছবিটি দেখার পর বুঝতে পারা যায় আমাদের সমাজের বেশ কিছু অসঙ্গতির ছবি। যার মুখোমুখি হয় দশ বছর বয়সী জামাল। ছবিটির মাধ্যমে শুধু অসঙ্গতির চিত্রই উঠে আসেনি, এসেছে গ্রাম বাংলার কিছু অসাধারণ জীবনী, যা হয়তো আমরা অনেকেই দেখিনি বাস্তব জীবনে।

এই সিনেমার সবচেয়ে অসাধারণ কাজ ছিল গ্রাম বাংলার দারুণ সব দৃশ্যায়ন। যা বেশ কয়েকজন কবিকে ও সিনেমার কথা মনে করিয়ে দেয়। যেমন গমক্ষেত, বাঁশঝাড় ও শুকনো পাতা ছাড়ানো আম বাগান। গমক্ষেত এর দৃশ্য বাংলা সিনেমায় এই প্রথম বার দেখা হলো। গমক্ষেতের দৃশ্য ধারণের ক্ষেত্রে ক্যামেরার ফ্রেম, লোকেশন ও আলোকচিত্র ছিল মনে রাখার মতো। দৃশ্যগুলো দেখলে বিদেশি বেশ কয়েকটি সিনেমার কথা মনে পরে যায়। সিনেমার পরিচালক বিজন ইমতিয়াজ এর দক্ষতা আসলে মুগ্ধ হওয়ার মতো। তিনি সিনেমার কিছু চরিত্র খুব অল্প সময়ের মধ্যে দেখিয়ে দিয়েছেন। যা সিনেমাকে প্রাণবন্ত করে তুলেছে। যেমন রোকেয়া প্রাচী, জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়, রামিজ রাজু, কচি খন্দকারসহ আরো কিছু চরিত্র বেশ শক্ত ভাবে চিত্রায়িত হয়েছে।

সিনেমায় পরিচালক গ্রামের কিছু ঐতিহ্য তুলে ধরেছেন, তবে তা অন্য সবার মতো করে। যা সিনেমার বাতিক্রমের কিছুটা হলে ও ব্যাঘাত করছে। যেমন : বাল্যবিবাহ, জোর করে যোতুক হিসেবে সাইকেল নেওয়া। তবে পরিচালকের একটা দিক আমার কাছে খুব ভালো লেগেছে। সেটা হলো যখন জামালের বাল্যকালের খেলার সাথী লক্ষীকে নিয়ে করে পালকি করে নিয়ে যাওয়ার সময় জামাল ও লক্ষী পালকি থেকে পালিয়ে ধান ক্ষেতের মধ্যে দিয়ে দৌড়ে যায়, সে দৃশ্যটি। যা সিনেমাটিকে অন্য একটা রূপ দিয়েছে। সিনেমায় লক্ষীর বিয়ের আগে ও পরের অভিনয় ছিল মনে রাখার মতো। ছোট্ট লক্ষী কী করে জামালকে সামলাতো এবং বিয়ের পরে লক্ষীর সংসার চালানো। সিনেমার বিশেষ একটি দৃশ্য পরিচালক খুব সুন্দর করে তুলে ধরেছেন। সেটি হলো একটি শিশু কী করে মায়ের কাছ থেকে তার আবদারটুকু আদায় করে নিতে হয়। তা দেখানো হয়েছে। যেখানে সিনেমায় আমরা দেখি মায়ের ওপর শুকনো পাতা ঢেলে দেওয়ার পর মায়ের আঁচল থেকে টাকা বের করার দৃশ্য। যা দেখে হয়তো অনেকের শৈশবে আব্দারের কথা মনে পড়বে।

এ ছাড়া সিনেমায় দুটি চরিত্র পরিচালক খুব সাহসিকতার সাথে তুলে ধরেছেন। একটি হলো জামালের মা ও অন্যটি হলো গ্রামের মসজিদের হুজুর। দুটি চরিত্রের মধ্যে পরিচালকের রসায়ন ছিল খুব বড় চ্যালেঞ্জ। যা মনির আহমেদ শাকিল খুব সাহসী ভুমিকায় নিজেকে আবারো প্রমাণ করেছেন। জামালের মায়ের চরিত্রে আমরা একটি অসহায় মেয়ে কী করে তার সন্তান নিয়ে সমাজে সংগ্রাম করে তা দেখতে পাই। যেখানে সমাজের কিছু মানুষরূপী বীভৎস কীটদের কারণে পরিবেশ দুর্বিষহ হয়ে ওঠে।

এই ক্ষেত্রে পরিচালক অন্য পরিচালকদের মতো গতানুগতিক প্রতিবাদী চরিত্র তুলে ধরেননি। তিনি এমন একটি প্রতিবাদী চরিত্র নিয়ে এসেছেন যা কিনা আমরা আমাদের সমাজে দেখতে পাই। সিনেমায় রাজ্জাক হুজুরের ভূমিকা ছিল মনে রাখার মতো। যা সিনেমাকে অন্য মাত্রা যোগ করে। সমাজের সকলকে এক চোখে না দেখে বাস্তবতার নিরিখে দেখা এই সিনেমার বিশেষ পাওয়া। শুধু তাই নয়, এক চোখে না দেখার কারণে হুজুরের উপর নির্যাতন ও অপবাদের চিত্রের উপস্থাপনও ভালো ছিল। হুজুরের একটি সংলাপ মনে রাখার মতো, পরকালে বিচার হয় আত্মার, দেহের নয়।

সিনেমার শেষ দৃশ্য ছিল মনে রাখার মতো। হুজুর কী করে জামালকে নিজ সন্তানের পরিচয় দিয়ে স্কুলে ভর্তি করায়। যা সিনেমা প্রদর্শনরত সকাল দর্শক করতালির মধ্যে দিয়ে উৎসাহ ও স্বাগত জানিয়েছে। যেখানে একটি কঠিন বাস্তবতা ও মায়ের অতীত ইতিহাসের কারণে জামাল নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিলো এবং মানব সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলো।