শ্রীদেবী
অভিনেত্রী
মম (২০১৮), ইংলিশ ভিংলিশ (২০১২), গুমরাহ (১৯৯৪), চাঁদনী (১৯৯০) চালবাজ (১৯৯০), সাদমা (১৯৮৪), ১৬ ভেইথিনাইল (১৯৭৭)।

 

শ্রীদেবী ভারতীয় অভিনয়শিল্পী। ভারতের তামিলনাড়ুতে জন্মেছেন এই অভিনেত্রী। হিন্দি, তামিল, তেলেগু, মালায়ালাম ও কন্নড় ভাষার চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। শিশু বয়স থেকে শুরু করে মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত অভিনয় করে গেছেন। তাঁকে বলিউডের নারী মহাতারকা বলা হয়।

জন্ম ও শৈশব
ভারতের তামিলনাড়ুর শিবাক্ষীতে জন্ম হয় শ্রীদেবীর, ১৯৬৩ সালের ১৩ আগস্ট। তার বাবা আইয়াপান আইনজীবী। মায়ের নাম রাজেস্বরী। শ্রদেবীর এক বোন শ্রীলতা। তার বৈমাত্রেয় ভাই আছে দুজন সাতিশ ও আনন্দ।

চলচ্চিত্রে অভিনয়
১৯৬৭-১৯৭৫: শিশুশিল্পী
শ্রীদেবী চার বছর বয়সে অভিনয় শুরু করেন। তামিল চলচ্চিত্রের নাম থুনাইভান। এই চলচ্চিত্রে তিনি মুরুগা চরিত্রে অভিনয় করেন। বেশ প্রশংসিত হন প্রথম অভিনয় দিয়ে। এই চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তিনি ডাক পান বেশ কয়েকটি তামিল ও তেলেগু চলচ্চিত্রে। শ্রীদেবী ছিলেন এমন একজন শিশুশিল্পী যে বিভিন্ন ভাষার চলচ্চিত্রে অভিনয় করতে পারদর্শী ছিলেন। পোমবাট্টা চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি কেরালা স্টেট ফিল্ম অ্যাওয়ার্ড-এ সেরা শিশুশিল্পীর পুরস্কার পান। এরপর তিনি একের পর এক চলচ্চিত্রে শিশুশিল্পী হিসেবে কাজ করতে থাকেন। কান্ডান কারুনাই (১৯৬৭), নাম নাড়– (১৯৬৯), প্রার্থানী (১৯৭০), বাবু (১৯৭১), ভাসান্থা মালিগাই (১৯৭২), মারাপুরানি মানিশি (১৯৭৩) ও জুলি (১৯৭৫) উল্লেখযোগ্য। জুলি সিনেমার মাধ্যমে বলিউডে তিনি শিশুশিল্পী হিসেবে কাজ শুরু করেন।

১৯৭৬-১৯৮২: দক্ষিণী সিনেমা
শ্রীদেবী দক্ষিণী সিনেমার যাত্রা শুরু তামিল মোনড্রু মুডিচু (১৯৭৬) সিনেমার মাধ্যমে। তখন তার বয়স ১৩! এই সিনেমায় তিনি তামিল দুই মহাতারকা কমল হাসান ও রজনীকান্তের বিপরীতে অভিনয় করেন। চলচ্চিত্রটি পরিচালনা করেন দক্ষিণের বিখ্যাত পরিচালক বালাচন্দর। চলচ্চিত্রটি বেশ আলোচিত হয়। তিনজনই এরপর বিভিন্ন সিনেমার প্রস্তাব পেতে শুরু করেন।

১৯৭৭ সালে শ্রীদেবী করেন গায়ত্রী (১৯৭৭) চলচ্চিত্রটি। এরপর করেন কাবিক্কুইল (১৯৭৭) কিন্তু একই বছর সবচেয়ে বেশি আলোচিত হন ১৬ ভেইথিনাইল সিনেমা দিয়ে। এই সিনেমাটি তামিল চলচ্চিত্রের একটি মাইলফলক। কারণ এই সিনেমাটি স্টুডিও ছেড়ে আউটডোরে শুটিংয়ের রাস্তা খুলে দেয়। এরপর থেকে তামিল সিনেমাতে আউটডোরে শুটিং করা শুরু হয়। আর এর মাধ্যমে শ্রীদেবীও মহাতারকা বনে যান।

এরপর ১৯৭৮ সালে তিনি নিয়ে আসেন আরেক ব্লকবাস্টার সিনেমা সিগাপ্পু রোজাক্কল। থ্রিলার ঘরানার সিনেমাটি ১৭৫ দিন প্রেক্ষাগৃহে চলে রেকর্ড সৃষ্টি করে। একই বছর আরেকটি জনপ্রিয় সিনেমা উপহার দেন তিনি প্রিয়া নামে। এ বছরই দ্বৈত চরিত্রে অভিনয় করেন ভানাকাটুকুরিয়া কাথালিয়ে চলচ্চিত্রে এবং ১৬ ভেইথিনাইল এর তেলেগু সংস্করণ পাডাহারেল্লা ভায়াসু চলচ্চিত্রে।

১৯৭৯ সালে তিনি উপহার দেন জনপ্রিয় তেলুগু চলচ্চিত্র কার্তিকা দিপাম (১৯৭৯)। একই বছর তিনি এন টি রামা রাও এর সঙ্গে করেন ভেটেগাডু (১৯৭৯) সিনেমাটি। তেলুগু দর্শকের কাছে বেশ জনপ্রিয় হয় এই জুটি। এরপর তাঁরা একসঙ্গে জুটিবদ্ধ হয়ে করেন ১২টি চলচ্চিত্র। একই বছর তিনি করেন তামিল চলচ্চিত্র কল্যাণারাম (১৯৭৯), থাইল্যামাল নান ইল্লাই (১৯৭৯), ধর্মা যুদ্ধাম (১৯৭৯)।

এ বছরই শ্রীদেবীর বলিউডে নারী কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিষেক হয় সলভা সাওয়ান (১৯৭৯) সিনেমার মধ্য দিয়ে। হিন্দি চলচ্চিত্রের প্রথম সিনেমায় তার বিপরীতে ছিলেন অমল পালেকর। চলচ্চিত্রটি তামিল ১৬ ভেইথিনাইল (১৯৭৭) সিনেমাটির হিন্দি সংস্করণ। সিনেমাটি বলিউডে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়।

১৯৮০ সালে শ্রীদেবী করেন তামিল জনি (১৯৮০) চলচ্চিত্রটি। প্রথম দিকে বক্স অফিসে খুব একটা সাড়া জাগাতে না পারলেও ধীরে ধীরে চলচ্চিত্রটির গান ও অভিনয় দিয়ে সাড়া জাগিয়ে ফেলে। একই বছর তিনি করেন ভারুমাইয়িন নিরাম শিভাপ্পু (১৯৮০) চলচ্চিত্রটি। এটি ১৯৮১ সালে তেলেুগ সংস্করণে করা হয় আকালি রাজিয়াম (১৯৮১) নামে। একই বছর তিনি করেন তামিল সিনেমা গুরু (১৯৮০), তেলুগু সিনেমা ছুট্টালুন্নারু জাগার্থা (১৯৮০) সিনেমাটি পরে যেটি অন্য সংস্করণে (রিমেক) করা হয় মাওয়ালি (১৯৮৩) নামে।

১৯৮১ সালে উল্লেখযোগ্য সিনেমার মধ্যে আছে তামিল মেন্ডাম কোকিলা (১৯৮১), তেলেগু কোন্ডাভেটি সিমহাম (১৯৮১), আগি রাভা (১৯৮১), পুলি বিদ্যা (১৯৮১), প্রেমাভিষেকাম (১৯৮১), আকালি রাজিয়াম (১৯৮১)। পরের বছর করেন ভাঝভি মায়াম (১৯৮২) ও পোক্কিরি রাজা (১৯৮২)। তেলেগু সিনেমাতেও ব্যাপক জনপ্রিয় চলচ্চিত্র উপহার দেন এই অভিনেত্রী যা পরবর্তীকালে হিন্দি সংস্করণ করা হয়। এর মধ্যে জাস্টিস চৌধুরী (১৯৮২) অন্যতম। যেটি ১৯৮৩ সালে একই নামে হিন্দি সংস্করণে বের হয় এবং পরের বছর তোহফা (১৯৮৪) নামেও করা হয়। তিনি ১৯৮২ সালে আরও কয়েকটি তেলেুগু সিনেমা উপহার দেন। বোবিলি পুলি (১৯৮২) ও অনুরাগা দেবাথা (১৯৮২) অন্যতম। তবে ১৯৮২ সালের তাঁর সবচেয়ে জনপ্রিয় তামিল সিনেমা ছিল মোনদ্রাম পিরাই (১৯৮২)। এই চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য তামিলনাড়– স্টেট ফিল্ম অ্যাওয়ার্ড পান সেরা অভিনেত্রী হিসেবে। একই চলচ্চিত্র পরের বছর হিন্দিতে সাদমা (১৯৮৩) নামে তৈরি করা হয়।

১৯৮৩-১৯৮৬: বলিউডের মহাতারকা
দক্ষিণে ইতিমধ্যে শ্রীদেবী মহাতারকা। এবার যাত্রা শুরু হলো বলিউডে। ১৯৮৩ সালে হিম্মতওয়ালা (১৯৮৩) চলচ্চিত্রে অভিনয় করে সাড়া ফেলে দেন। এটা ছিল তেলুগু চলচ্চিত্র ওরিকি মোনাগাদু (১৯৮১) চলচ্চিত্রের হিন্দি সংস্করণ। একই বছর আরও কয়েকটি দক্ষিণী ছবির হিন্দি সংস্করণ করে সাড়া ফেলে দেন শ্রীদেবী। এই বছরেই সাদমা (১৯৮৩) করে নিজেকে চেনান আরও একবার। এবং বলিউডের মহাতারকা রূপে দেখা দেন।

বলিউড ছাড়াও শ্রীদেবী একই সময়ে দক্ষিণী বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্র করেন। এর মধ্যে শ্রী রাঙ্গা নেথুলু (১৯৮৩), রামারাজিয়ামলো ভিমারাজু (১৯৮৩), অদুথা ভিরাসু (১৯৮৩), মুনডাদুগু (১৯৮৩) অন্যতম।

এরপর একের পর এক বলিউড জনপ্রিয় ছবি উপহার দিতে থাকেন শ্রীদেবী। তোহফা (১৯৮৪), মাকসাদ (১৯৮৪), আকালমান্দ (১৯৮৪), ইনকিলাব (১৯৮৪), জাগ উথা ইনসান (১৯৮৪) অন্যতম। ইনকিলাব চলচ্চিত্রের মাধ্যমে প্রথম একসঙ্গে অভিনয় করেন অমিতাভ বচ্চন ও শ্রীদেবী। বলিউডের কাজের মাঝেও শ্রীদেবী দক্ষিণী চলচ্চিত্রে কাজ করেন। উল্লেখ করার মতো চলচ্চিত্র ছিল কোডে তেরাচু (১৯৮৪) ও কৃষ্ণ কাঞ্চু কাগড়া (১৯৮৪)।

তবে বলিউডে একের পর এক জনপ্রিয় চলচ্চিত্র উপহার দিতে থাকেন তিনি। এর মধ্যে সারফারোশ (১৯৮৫) ও বলিদান (১৯৮৫) অন্যতম। চালিয়ে যান দক্ষিণী সিনেমাও। ওকা রাধা ইদারু কৃষ্ণুলু (১৯৮৫) ও কৃষ্ণা বিজরাযুদ্ধাম (১৯৮৫) উল্লেখযোগ্য।

পরের বছরও শ্রীদেবী জনপ্রিয়তার ধারা চলতে থাকে। ঘর সংসার (১৯৮৬), ধর্ম অধিকারী (১৯৮৬), সুগান (১৯৮৬), আখেরি রাস্তা (১৯৮৬), কর্ম (১৯৮৬), নাগিন (১৯৮৬) উল্লেখযোগ্য। এ বছরই শ্রীদেবীর জনপ্রিয়তার পারদ আকাশচুম্বী হয়ে যায়। পাঁচ বছর আগে তাঁকে বুকিং না দিলে সিনেমাতে তাঁকে পাওয়া কঠিন হয়ে যায় পরিচালকদের জন্য। বলিউডে অমিতাভ বচ্চনের পরেই শ্রীদেবী সর্বোচ্চ পারিশ্রমিক নেওয়া শুরু করেন।

১৯৮৭-১৯৯০ ভারতের প্রথম নারী মহাতারকা
নাগিন (১৯৮৬) এর সাফল্যের পর মি. ইন্ডিয়া (১৯৮৭) তে অভিনয় করেন। একে একে করেন আওলাদ (১৯৮৭), মায়াজাল (১৯৮৭), ওয়াতান কি রাখওয়ালে (১৯৮৭), জওয়াব হাম দেঙ্গে (১৯৮৭)। এই সময়ে শ্রীদেবী অনেক সিনেমা বাদ দেন ছোট চরিত্রের জন্য। তাকে তুলনা করা শুরু হয় অমিতাভ বচ্চনের সঙ্গে। সিনেমা ম্যাগাজিন ও খবরের কাগজগুলো প্রথমবারের মতো পুরুষ তারকাদের সঙ্গে নারী তারকাদের তুলনা করা শুরু হয় তাঁর মাধ্যমে। অমিতাভ বচ্চন ও শ্রীদেবীকে সমানভাবে গুরুত্ব দেওয়া শুরু হয় বলিউডে। তিনি ঘোষণা ছাড়াই হয়ে ওঠেন নারী মহাতারকা। এই সময়ে আরও বেশ কিছু জনপ্রিয় চলচ্চিত্র উপহার দেন এই অভিনেত্রী।

১৯৯১-১৯৯৭: শেষ ঝলক
এই সময়কে বলা হয় শ্রীদেবীর রাজত্বের শেষ সময়। ১৯৯১ সালে শ্রীদেবী তিনটি সিনেমায় অভিনয় করেন। এর মধ্যে ফারিশতে (১৯৯১) ও লামহে (১৯৯১) উল্লেখযোগ্য। দক্ষিণের সিনেমা কাষাণা কিষাণাম (১৯৯১) বেশ জনপ্রিয় হয়। ১৯৯২ সালে তাঁর উল্লেখযোগ্য সিনেমা ছিল খুদা গাওয়া (১৯৯২)। ১৯৯৩ সালে করেন তার বহুল প্রতিক্ষিত সিনেমা গুরুদেব (১৯৯৩)। এই বছরই তাঁর ছেয়ে ছোট তারকাদের সিনেমাতে অভিনয় শুরু করেন শ্রীদেবী। সালমান খানের সঙ্গে করেন চন্দ্রমুখী (১৯৯৩)। এ ছাড়া সঞ্জয় দত্তের সঙ্গে করেন গুমরাহ (১৯৯৩)। এই সময়ে হিন্দি, তামিল, তেলুগু, মালয়ালাম ও কন্নড় ভাষায় বেশ কিছু জনপ্রিয় সিনেমা উপহার দেন। ১৯৯৭ সালে জুড়ি সিনেমা শ্রীদেবীর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই সিনেমার শুটিং চলাকালীন তাঁর মা মারা যান এবং বণি কাপুরকে বিয়ে করেন।
 
১৯৯৮-২০১১: বিরতি
এই শ্রীদেবী সংসারে মনযোগী হন। তেমন একটি সিনেমাতে অভিনয় করেননি। উল্লেখযোগ্য সিনেমা বলা যায়, শক্তি দ্য পাওয়ার (২০০২) ও মেরি বিবি কা জওয়াব নেহি (২০০৪)। এ ছাড়া ২০০৯ সালে টিভি অনুষ্ঠান ১০ কা দম এ অংশগ্রহণ করেন।

২০১২: আবার ফিরে আসা
২০১২ শ্রীদেবী আবার সিনেমাতে ফিরে আসেন। ইংলিশ ভিংলিশ (২০১২) সিনেমার মাধ্যমে ফের প্রশংসা কুড়ান। এটা ছিল শ্রীদেবীর ৩০০তম সিনেমা। ২০১৫ সালে করেন তামিল সিনেমা পুলি (২০১৫)। ২০১৮ সালে করেন মম। এই সিনেমায় অভিনয়ের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান।

ব্যক্তিগত জীবন

শ্রীদেবী ১৯৯৬ সালে ২ জুন বনি কাপুরকে বিয়ে করেন। ঘোষণা করেন পরের বছর জানুয়ারি মাসে। তাদের ঘরে আছে দুই মেয়ে জাহ্নবী ও খুশি। শ্রীদেবী পেইন্টি পছন্দ করতেন। এবং আজীবন পেইন্টিং করেছেন। তিনি ভারতীয় সিনেমার একমাত্র নাচিয়ে যিনি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নাচ শেখেননি। ২০১৮ সালে ২৪ ফেব্রুয়ারি দুবাইয়ের একটি হোটেলে বাথটাবের ভেতর তিনি মারা যান। মনে করা হয় তিনি গোসল করতে গিয়ে হার্ট অ্যাটাকে মারা যান। তিনি বিভিন্ন পুরস্কার পান তার মধ্যে পদ্মশ্রী উল্লেখযোগ্য।