পরিচালক: প্রশান্ত গোরে
কলাকুশলী: অমিত কুমার শর্মা, ওমান হারজানি
দেশ: ভারত
সাল: ২০১৭
রেটিং: ৩/৫

ঘুমাবার আগে ইউটিউবে তামিল হিন্দি ডাবড ছবি দেখা একটা নেশার মতো হয়ে গেছিলো। সেই অভ্যাসে একটা রোগও খাড়া হয়ে যায়। একটা ছবির কিছু অংশ দেখার পরে মনে পড়ে, আরে এ ছবিতো আমি দেখেছি। ছোট ভাই একদিন বলল, আমাদের সব ছবি দেখা শেষ। এখন নতুন ছবি খুঁজতে হবে। আমরা নতুন ছবি খুঁজি। খুঁজতে খুঁজতেই দেখা মেলে ‘১৯৮২ আ লাভ ম্যারেজ’ ছবিটির।

এই ছবিটি এত আহামরি জাতের কোনো ছবি নয়। কোনো তারকা নেই। ছবির দৃশ্যও অতটা শিল্পসম্মত (তথাকথিত) নয়। বাহারি শটও নেই। গল্পও অতটা চিত্তাকর্ষক নয়। সাদামাটা প্রেমের গল্প। আপনি যদি হাতের কাছে পেয়ে কোনো বই অগত্যা পড়ে ফেলেন। তার মতো। যে বই নিয়ে আপনি কখনো কাউকে গল্পও বলবেন না। এই ছবিটি তেমন। ঘুমোবার আগে হাতের কাছে পেলাম তো দেখে নিলাম। ঘুম থেকে উঠে ভুলে যাব। তবে ছবিটি নিয়ে আবার লিখছি কেন? সে প্রশ্নের উত্তর দিতেই ছবিটি নিয়ে লিখতে বসা।

এই ছবিটি যদি বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান, মায়ানমার কিংবা আফ্রিকিয় কোনো দেশে তৈরি হতো, তবে আমার কোনো কথা ছিল না। কারণ এসব দেশে এখনো সিনেমা শিল্পটি অতটা জাঁকালোভাবে গড়ে উঠেনি। কিন্তু ছবিটি যদি হয় ভারতের, যেখানে বলিউড, তামিল, মালায়লাম, তেলেগুর মতো বড় বড় সিনেমা কারখানা গড়ে উঠেছে তবে দু চারটে বাতচিৎ তো করাই যায়। কারণ কোটি কোটি টাকার ব্যবসার ভিড়ে এই ছবিটি যে নিতান্তই গরিবি বাজেটে বানানো। এমনকি ওই সময়ে মুক্তি পাওয়া আলিগড় ও তেরে বিন লাদেন : ডেড অর অ্যালাইভ এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে হলও পাবে না ছবিটি, এমনটি ধারণা ছিল প্রযোজক শিব কুমার শর্মার। সে যাই হোক আসল কথায় আসি। এই ছবিটি নিয়ে কথা বলার মূল কারণ, গরিবি বাজেটে ভালো ছবি নির্মাণের সাহস ও কৌশল।

ছবির গল্প আশির দশকের। লাভ ম্যারেজ করে বিয়ে করবে প্রেম। কিন্তু নিয়তি তাঁকে অ্যারেঞ্জ ম্যারেজের দিকে ঠেলে দেয়। বাসর রাতে সে বউকে বলে তাঁর ইচ্ছা ছিল লাভ ম্যারেজ করে বিয়ে করার। কিন্তু তা কী করে সম্ভব? বিয়ে তো হয়েই গেছে। ওদিকে তখন ওই এলাকায় লাভ ম্যারেজকারীদের জুতা পেটা করার সংস্কৃতি। এমন অবস্থায় প্রেম গো ধরে সে লাভ ম্যারেজ করেই বিয়ে করবে। তাঁর নব্য বিবাহিতা স্ত্রী সুমানকে সে একথা জানায়। বিয়ের মধ্যেই কী করে তাঁরা লাভ ম্যারেজ করবে? এটা কি লাভ ম্যারেজ হবে? নাকি অ্যারেঞ্জ ম্যারেজই? এই দ্বন্দ্ব নিয়ে ছবিটি আগায়।

ছবির গল্প বলা আমার উদ্দেশ্য নয়। গল্প অন্য রোমান্টিক গল্পের মতোই। ছোট ছোট রোমান্টিক দৃশ্য। মান অভিমান। দুই অপরিচিত মানুষের নতুন করে প্রেমে পড়া ইত্যাদি। তবে এই ছবিটি দেখব কেন? দেখার একটাই কারণ বলতে পারি, ছবিটিতে পরিচিত সব দৃশ্য থাকতেও আপনি বিরক্ত হবেন না। আশির দশকের আপনার বাবা–মার প্রেমটি অনায়াসেই উঠে আসে পরিচালক প্রশান্ত গোরের সিনেমায়। তবে এর জন্যও এই লেখাটি নয়। এই লেখাটি লিখছি বলিউডের বড় বড় বাজেটের ছবির পাশে দাঁড়িয়ে গরিবি বাজেটের ছবি বানানোর সাহস দেখে। এই সাহস যিনি করেছেন তিনি যে যথার্থ সাহসী তার প্রমাণ মেলে ছবির গল্প বলার ভঙ্গি দেখে। এই ছবির সবথেকে বড় শক্তির জায়গা আমার কাছে মনে হয়েছে এর গল্প বলার ভঙ্গি। সাদামাটি গল্পটি পরিচালক বললেন মাত্র দুটি চরিত্র দিয়ে। গল্পের প্রোটাগোনিস্ট প্রেম ও সুমন। তারা দুজনই গল্পের শতকরা নব্বইভাগ জুড়ে। আর এটি এমনভাবেই তিনি বলেছেন যে, আপনার কখনো মনে হবে না, এই দুইজনকে দিয়েই কেন গল্পটি বললেন? আর কোনো তারকা নেওয়া হল না কেন? গল্পের বুননে তিনি এতটাই দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। বলিউডের নামকরা অভিনেতাদের অভিনয় এখানে নেই। তবু কত সুন্দর ও সাবলীল অভিনয় করলেন প্রমরূপী অমিত কুমার ও সুমান রূপী ওমনা হারজানি। অথচ হিন্দি ছবি আপাদমস্তক মুখস্ত করা অনেক দর্শক এই নামদুটি জানেন না হয়তো! আমিও জানতাম না। যদিও হিন্দি ছবি দেখায় আমার নম্বর হতে পারে দশের মধ্যে মাত্র তিন। গল্প বুননের এই শক্তি পরিচালক কোথা থেকে পেলেন তার একটা খোঁজ লাগাই। ছবিটির বাজেট যেমন গরিব অন্তর্জালে এ নিয়ে তথ্য উপাত্তের সংখ্যাও নিতান্তই গরিবি পর্যায়ের। ঘেটেঘুটে যতটুকু পাই তাতে একটি তথ্য দেখে ভড়কে যাই। মনে মনে বলি, ছবিটি অযথাই ভালো ছবি হয়ে ওঠেনি। এর পেছনের মানুষ ভালো ছবি বানানোর অভিজ্ঞতায় ঠাঁসা। ছবির পরিচালক প্রশান্ত গোরে ভারতীয় বিখ্যাত পরিচালক সুধীর মিশ্রর সহাকারী পরিচালক ছিলেন। সুধীর মিশ্রকে নিয়ে বলব না, আগ্রহ থাকলে আপনিই জেনে নিনি কে তিনি। কসম, ঠকবেন না।
বলিউডের রঙচঙা ছবির ভিড়ে এই ছবিটি নয়ে কেন এত কথা পাড়লাম তাঁর একটা উদাহরণ দিয়েই শেষ করব। এই ছবিটি ইউটিউবে দেখা যায়। সেখানে একজন মন্তব্য করেছেন এইভাবে, ‘ভারতীয় পরিচালকেরা তখনই একটি ভালো ছবি বানায়, যখন তাদের কাছে গরিবি বাজেট থাকে আর অতি অভিনয়কারী এবং তারকা অভিনয়শিল্পী থাকে না।’